23/07/2025
“মুক্তিযুদ্ধের পরের বছর পদ্মায় যেমন ইলিশ উঠছিল, অমন ইলিশ তার আগে কোনোদিন দেখা যায় নাই।”
ইলিশের দাম নিয়ে কথা বলতে বলতে আমার বাবা আচমকা বলে উঠলো।
কারেন্ট চলে গিয়েছিল, উঠোনে বসে গল্প হচ্ছিল।
“যুদ্ধের সময় পদ্মা ছিল লাশের সবচেয়ে বড় আশ্রয়।
মিলিটারিরা চোখ বেঁধে, লাইন ধরে দাঁড় করিয়ে গুলি করে নদীতে ফেলে দিতো।
রাজাকাররা রাতে জবাই করে লাশ ভাসিয়ে দিতো।
অনেককে তো জীবন্ত অবস্থায় পায়ে কলসি বেঁধে নদীতে ছুঁড়ে ফেলা হতো।
লাশগুলো পঁচে যেতো, পেট ফুলে ভেসে উঠতো।
ঘাটে বাঁশ রেখে দিতে হতো – যাতে কেউ লাশ দেখলে ঠেলে আবার মাঝ নদীতে পাঠিয়ে দিতে পারে।
মানুষ আসতো নদীর পাড় দিয়ে, হয়তো কাউকে খুঁজতে।
জিজ্ঞেস করতো – লম্বা, ফর্সা গায়ের রঙ, বাবরি কাটা চুল… এমন কাউকে ভাসতে দেখেছেন?
কখনো বলতো, মেয়েটার চুলে লাল ফিতা ছিল… দেখেছেন কিছু?
জবাব কেউ দিতে পারতো না ঠিকঠাক।
কারও যদি কিছু মনে পড়ে, বলতো – দুপুরে এক লাশ দেখছিলাম, ঠেলে দিয়েছি মাঝ নদীতে।
অভিযোগ করতে চাইলেও থেমে যেতো সবাই।
কিসের অভিযোগ করবে? কার কাছে করবে?
নদীতে জাল ফেললে উঠে আসতো পঁচা গন্ধ, পচা শরীর।
মাছ ধরতে কেউ যেতো না খুব একটা – মিলিটারির ভয় তো ছিলই।
তবে সেই সময় পদ্মা ভরে উঠেছিল লাশের তেল আর মাংসে।
শকুনে তো আর সব খেতে পারে না – বাকি ছিল সব মাছের ভাগ্য।
ইলিশ, যা কিনা সাধারণত ঘাসপাতা খায়, সেও তখন শিখে গেল পঁচা মাংস আর পোকা খাওয়া।
দিন যায়, ইলিশগুলো হয়ে উঠলো বিশাল সাইজের – ২ কেজি, ৩ কেজি ওজন!
জাল ফেললেই চকচকে, পিছল ইলিশ উঠে আসত।
ইলিশের পিঠের লাল মাংস দেখে আমরা বলতাম – হরিণের মাংস।
কিন্তু যুদ্ধের সময় দেইখা, ওই লাল মাংসও আর হরিণের মতো লাগতো না।
মনে হতো, মানুষেরই মাংস খাচ্ছি!
অনেকদিন মাছ খাওয়া মুশকিল হয়ে গিয়েছিল।
খেতে গেলে মনে হতো – কার মাংস খাচ্ছি জানি না…
তবুও, সংগ্রামের পরে পদ্মায় যে মাছ উঠেছিল –
সেই ইলিশ একেকটা যেন যুদ্ধ শেষের পুরস্কার!
অমন ইলিশ, আর কোনোদিন দেখা যায় নাই।”
📝 লেখক: ®️ ইলিশ
📅 তারিখ: ২৬ জুন ২০২৫