03/06/2026
তারেক রহমানের জীবন নাশের আশংকা : রাজনৈতিক ক্যু বাস্তবতা ও গুজব
-----------------------
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস বারবার সহিংসতা, অভ্যুত্থান এবং নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের সাক্ষী হয়েছে। ২০২৬ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের লাল টেলিফোনের কপার ক্যাবল কাটা ও চুরির ঘটনা এই উদ্বেগকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ব্লিটজ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীসহ কিছু মহল থেকে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে যে, ড. মুহাম্মদ ইউনূসসহ আন্তর্জাতিক শক্তি তারেক রহমানকে হত্যা করে দায় শেখ হাসিনার উপর চাপিয়ে “এক ঢিলে দুই পাখি” মারার ষড়যন্ত্র করছে। এই প্রতিবেদনে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সাম্প্রতিক ঘটনাবলি, অভিযোগের যাচাই এবং ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
-----------------------
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড: রাজনৈতিক সহিংসতার শিকড়
বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা শুরু করলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতার নাম আসে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড। ভোররাতে সেনাবাহিনীর একদল বিদ্রোহী কর্মকর্তা (মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরসহ) সার্কিট হাউজে হামলা চালিয়ে জিয়াউর রহমান, তার দুই সহকারী ও ছয় দেহরক্ষীকে হত্যা করেন। এটি একটি ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থানের অংশ ছিল। জিয়া চট্টগ্রামে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘর্ষ মেটাতে গিয়েছিলেন।
এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গভীর ক্ষত সৃষ্টি করে। বিএনপির সমর্থকরা এটিকে ষড়যন্ত্রমূলক হত্যা হিসেবে দেখেন। সামরিক আদালতে বিচার হয়, কয়েকজনের ফাঁসি কার্যকর হয়, কিন্তু উচ্চপর্যায়ের সম্পৃক্ততা নিয়ে এখনো বিতর্ক আছে। জিয়াউর রহমানের পুত্র তারেক রহমান এই ছায়া বহন করছেন। এ ঘটনা দেখায় যে, রাজনৈতিক নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভ্যন্তরীণ ও সামরিক হুমকি কতটা বাস্তব।
-----------------------
খালেদা জিয়ার মৃত্যু: স্বাভাবিক না সন্দেহজনক?
খালেদা জিয়া ৩০ ডিসেম্বর ২০২৫ সালে এভারকেয়ার হাসপাতালে মারা যান। দীর্ঘদিন লিভার সিরোসিস, কিডনি সমস্যা, হৃদরোগ ও অন্যান্য জটিলতায় ভুগছিলেন। হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের ব্রিফিং ও অফিসিয়াল তথ্য অনুযায়ী এটি স্বাভাবিক মৃত্যু। রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা হয় এবং জিয়া উদ্যানে দাফন সম্পন্ন হয়।
কিছু মহলে দাবি করা হয় যে, তাকে অসুস্থ অবস্থায় অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, চিকিৎসক টিমে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ছিলেন এবং “আগেই মারা গেছেন” বলে লাশ লুকিয়ে রাখা হয়েছে। কাতারের এয়ার অ্যাম্বুলেন্স অফার প্রত্যাখ্যান এবং তারেক রহমানের স্ত্রীর সঙ্গে ছবিতে AI ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। তবে নিরপেক্ষ সূত্র, হাসপাতাল রেকর্ড ও গণমাধ্যম প্রতিবেদন এসব দাবির পক্ষে কোনো প্রমাণ দেয় না। দীর্ঘ অসুস্থতাই মৃত্যুর কারণ বলে স্বীকৃত। এ ধরনের গুজব রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ায় কিন্তু প্রমাণিত ষড়যন্ত্র নয়। ষড়যন্ত্র মতামতের দাবি মৃত্যুর কারণ তদন্তর দাবি রাখে।
-----------------------
ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড: টার্গেটেড সহিংসতার উদাহরণ
২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর ঢাকার বিজয়নগরে জুমার নামাজের পর ইনকিলাব মঞ্চের নেতা শরিফ ওসমান বিন হাদিকে মোটরসাইকেল আরোহীরা মাথায় গুলি করে। তিনি সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর মারা যান। ডিবি তদন্তে চার্জশিট দিয়েছে; মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে সাবেক কাউন্সিলর তাইজুল ইসলাম চৌধুরী (বাপ্পী) এবং গুলিকারী ফয়সাল করিমসহ অন্যদের নাম উঠেছে। কয়েকজন ভারতে পালিয়ে আছে।
হাদির মাথায় গুলির ধরন, হাসপাতালে পরিবারকে সীমিত অ্যাক্সেস এবং জানাজায় কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে সন্দেহ আছে। অনেকে এটিকে রাজনৈতিক টার্গেটেড কিলিং বলে মনে করেন। এ ঘটনা প্রমাণ করে যে, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এখনো সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। তদন্ত চলছে এবং বিচারের দাবি জোরালো।
-----------------------
লাল টেলিফোনের তার কাটা: নিরাপত্তা দুর্বলতার সতর্কবার্তা
১ জুন ২০২৬ সালে সচিবালয়ের পুরোনো ২ নম্বর ভবন থেকে নতুন ১ নম্বর ভবন পর্যন্ত কপার ক্যাবল কাটা ও চুরির ঘটনায় প্রধানমন্ত্রীর লাল (রেড) টেলিফোনসহ গুরুত্বপূর্ণ লাইন ৭-৮ ঘণ্টা অচল হয়। বিটিসিএল সংযোগ পুনরুদ্ধার করে। থানায় জিডি হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, গোয়েন্দা সংস্থা ও পুলিশ তদন্ত করছে।
রেড টেলিফোন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের জন্য ব্যবহৃত হয়। এ ঘটনা সচিবালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থায় দুর্বলতা তুলে ধরেছে। বহিরাগতদের অবাধ চলাচল নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এটি জাতীয় নিরাপত্তার জন্য স্পর্শকাতর সংকেত।
-----------------------
সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরীর অভিযোগ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের দাবি
ব্লিটজ সম্পাদক সালাহ উদ্দিন শোয়েব চৌধুরী দাবি করেছেন যে, ড. ইউনূস ফ্রান্সে গিয়ে ওয়াগনার গ্রুপ, আইআরএ এবং আন্তর্জাতিক ভাড়াটে খুনিদের সঙ্গে মিটিং করেছেন। পিনাকি ভট্টাচার্যের উপস্থিতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। উদ্দেশ্য: তারেক রহমানকে হত্যা করে দায় শেখ হাসিনার ওপর চাপিয়ে দেওয়া। তিনি বলেন, তার কাছে প্রমাণ আছে কিন্তু নিরাপত্তার কারণে প্রকাশ করবেন না। তারেক রহমান চাইলে সরাসরি দেখাতে পারেন।
এগুলো গুরুতর অভিযোগ। তবে নিরপেক্ষ সূত্রে ওয়াগনার গ্রুপ বা ভাড়াটে খুনিদের সঙ্গে ইউনূসের যোগাযোগের কোনো যাচাইকৃত প্রমাণ পাওয়া যায়নি। শোয়েব চৌধুরী এ ধরনের ষড়যন্ত্রমূলক বক্তব্যের জন্য পরিচিত। তার কিছু বক্তব্য সত্য প্রমান হওয়ার নজিরও রয়েছে, কিছু বক্তব্য এখনো আলোর মুখ দেখেনি তবে অসত্য হয়েছে এমন নজিরও পাওয়া যাচ্ছে না। এসব দাবি আতঙ্ক তৈরি করতে পারে কিন্তু প্রমাণ ছাড়া গ্রহণযোগ্য নয়।
-----------------------
“এক ঢিলে দুই পাখি” এবং জনগণের ক্লান্তি
শোয়েব চৌধুরীসহ কেউ কেউ বলছেন, তারেক রহমানকে সরিয়ে দিয়ে দায় শেখ হাসিনার ওপর চাপিয়ে জনগণের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হবে। জুলাই বিপ্লবের পর “মব সরকার” থেকে নতুন সরকারে আসার দীর্ঘ লড়াইয়ে পর জনগণ ক্লান্ত। এক অস্থিরতা থেকে আরেক অস্থিরতায় যাওয়ার মতো শক্তি ক্লান্ত জাতির নেই। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, আইনের শাসন ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন। অপ্রমাণিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ছড়িয়ে অস্থিরতা বাড়ানো উচিত নয়।
-----------------------
তারেক রহমানের নিরাপত্তা: বাস্তবতা ও প্রয়োজনীয়তা
তারেক রহমান লন্ডন থেকে ফিরে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর SSFসহ উচ্চমানের নিরাপত্তা পেয়েছেন। বুলেটপ্রুফ বাস ব্যবহারসহ বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। লাল টেলিফোন ঘটনা অভ্যন্তরীণ হুমকির ইঙ্গিত দেয়। জিয়া ও খালেদার ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে তার নিরাপত্তা বলয় আরও জোরদার করা উচিত। সিসিটিভি, ইন্টেলিজেন্স শেয়ারিং এবং প্রোটোকল আধুনিকায়ন জরুরি।
-----------------------
জাইমা রহমানের নিরাপত্তা জোরদারকরণ
তারেক রহমানের একমাত্র সন্তান ব্যারিস্টার জাইমা রহমান পরিবারের পরবর্তী উত্তরসূরি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ। তার নিরাপত্তায় CSF-এর নারী সদস্যসহ বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। নারী নেতৃত্বের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সতর্কতা দরকার। জাইমা নিজেও নারী নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলেছেন। পরিবারের রাজনৈতিক ইতিহাস বিবেচনায় তার জন্য বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা অপরিহার্য।
-----------------------
সতর্কতা, সত্যতা ও স্থিতিশীলতা
তারেক রহমানের জীবন নাশের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। লাল টেলিফোনের মতো ঘটনা বাস্তব হুমকির ইঙ্গিত দেয়। তবে অপ্রমাণিত ষড়যন্ত্র তত্ত্ব (ওয়াগনার গ্রুপ, পিনাকি-ইউনূস মিটিং ইত্যাদি) ছড়িয়ে আতঙ্ক তৈরি করা জাতীয় স্বার্থবিরোধী। সরকারের উচিত স্বচ্ছ তদন্ত, নিরাপত্তা আধুনিকায়ন এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা প্রচার করা। জনগণের উচিত প্রমাণভিত্তিক তথ্য অনুসরণ করা।
পরিশেষে বলা যায়, তারেক রহমান লন্ডন থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসা কোন ব্যক্তি নয়। জাতির ক্রান্তি লগ্নে হাল ধারার জন্য একজন আইকন দরকার ছিলো। তারই ধারাবাহিকতায় মি. রহমানকে বিভিন্ন যদি কিন্ত দ্বারা জনগণ নিয়ে এসেছে। ঘন্টাধিক সময়ের মধ্যে ভোটার হিসেবে তালিভুক্ত করে নির্বাচন করিয়ে জনপ্রিয়তার চেয়েও বেশি কিছু জনগণ দেখিয়ে তাকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে। তার জীবনের সাথে দেশের ১৮+ কোটি মানুষের ভাগ্য জড়িয়ে রয়েছে। কতিপয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিপদগামী মানুষের চিন্তা ভাবনার শিকার হয়ে দূর্ঘটনা জাতি নিতে পারবে না। আগের সরকারের ভিশন ২০৪১ এখন গোলামীর ২০৪১ এ পতিত হয়েছে। কিন্তু তারেক রহমানের অবর্তমানে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ত কালের অন্ধকার গহব্বরে নিয়ে যাবে জাতিকে, যেখান থেকে আর ফেরা হবেনা।
বাংলাদেশের রাজনীতি যেন আর রক্তাক্ত না হয় — এটাই সকলের কাম্য। এক মব সরকারের ক্লান্তি থেকে বেরিয়ে স্থিতিশীল গণতন্ত্র গড়ে তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। সরকারের স্থিতিশীলতার জন্য আইন মেনে চলি, অন্যকে আইন মেনে চলতে উদ্ভুদ্ধ করি। নিরাপত্তা জোরদারকরণের পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করার দাবি জানাই।
লেখক:
নিপুণ চন্দ্র, মফস্বল সম্পাদক, দৈনিক বর্তমান বাংলা। [email protected]