16/05/2026
উন্নয়ন প্রকল্প শুরু হয়, বছরের পর বছর কাজ চলে, কিন্তু সেগুলো কখনো শেষ হয় না। বাংলাদেশে এমন অসম্পূর্ণ প্রকল্পের সংখ্যা হাজারের উপরে। এক এলাকায় দেখা যায় তিন বছর ধরে সড়ক নির্মাণ চলছে, কিন্তু এখনো অর্ধেকও হয়নি। অন্য এলাকায় আছে ভাঙা পুল, যা তিন বছর ধরে মেরামত হচ্ছে না। আরও একটি এলাকায় দেখা যায় স্কুল-কলেজ নির্মাণ স্থগিত হয়েছে, ছাত্ররা এখনো টিনের ঘরে ক্লাস করছে। এটি শুধু নির্মাণ প্রকল্পের অসমাপ্তির গল্প নয় — এটি হলো রাষ্ট্রের ব্যর্থতা ও অব্যবস্থাপনার চিত্র। বাংলাদেশের উন্নয়ন বাজেট বছরের পর বছর বাড়ছে। কিন্তু এই বাজেটের কতটা বাস্তবে কাজে লাগছে? বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২০२৬ অর্থবছরে উন্নয়ন বাজেট ছিল ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। এক লাখ ছয় হাজার কোটি টাকা বছরে ব্যয় হচ্ছে উন্নয়ন কাজে। এই অঙ্কটা যদি ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ভাগ করেন, তাহলে একজনের জন্য বছরে পড়ে মাত্র ৬৬ টাকার মতো। আর যা আসলে পৌঁছায়, তার পরিমাণ আরও কম। কারণ প্রকল্পের নামে অর্থ বরাদ্দ হয়, প্রকল্পের কাজ হয় না। অঙ্কটা বাড়লেও মানুষের জীবনমান বাড়ে না। বিশ্বব্যাংক এবং এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক বছরের পর বছর ধরে বলে আসছে, বাংলাদেশে অবকাঠামো প্রকল্পগুলো কার্যকর নয়। কেন? কারণ প্রকল্পগুলো সঠিকভাবে পরিকল্পনা করা হয় না, বাস্তবায়ন সঠিকভাবে হয় না, এবং মনিটরিং থাকে না। এর বাইরে আছে দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতা, যা প্রতিটি প্রকল্পের খরচ বাড়িয়ে দেয়। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক নির্মাণে বছরের পর বছর লেগেছে। সেতু নির্মাণে কয়েক বছর পিছিয়ে গেছে। নদীবন্দর সম্প্রসারণে বিলম্ব হয়েছে। এসব বিলম্বের খরচ কী? আপনি যদি একটি সড়ক প্রকল্পের জন্য ১০০ টাকা বাজেট করেন, এবং তিন বছরে সেটা শেষ হয় তাহলে ইনফ্লেশনের কারণে খরচ বেড়ে দাঁড়াবে ১२०-१३० টাকার মতো। অর্থাৎ বিলম্বের কারণে অতিরিক্ত ২०-३० টাকা খরচ হচ্ছে। আর এই অতিরিক্ত খরচগুলো কোথা থেকে আসছে? অর্থনীতি থেকে। বাংলাদেশে অনেক উন্নয়ন প্রকল্প আছে যেগুলোর সামাজিক সুবিধা নেই বললেই চলে। বড় শহরে মেট্রো রেল প্রকল্প চলছে, যা মূলত শহুরে মানুষের জন্য। গ্রাম এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নেই, পানীয় জল নেই। কিন্তু বাজেটের বেশিরভাগ চলে যাচ্ছে শহরের অবকাঠামোতে। এর ফলে সম্পদের বণ্টন আরও অসমান হয়ে যাচ্ছে। যারা শহরে আছেন তারা সুবিধা পাচ্ছেন, যারা গ্রামে আছেন তারা উপেক্ষিত থাকছেন। এটা উন্নয়ন নয়, এটা বৈষম্য। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, উন্নয়ন প্রকল্পগুলো স্বচ্ছতার সাথে গ্রহণ করা হয় না। তথ্যের স্বাধীনতা আইনের মাধ্যমে নাগরিক যখন প্রকল্প সম্পর্কে তথ্য চায়, তখন অনেক সময় পায় না। কেন? কারণ তথ্য সরাজ্ঞান করে দিলে দুর্নীতি ধরা পড়বে। কিন্তু যখন দুর্নীতি লুকানো হয়, তখন প্রকল্প ভালোভাবে বাস্তবায়ন হয় না, এবং মানুষ উপকৃত হয় না। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরেও অনেক সমস্যা দেখা যায়। যেমন বাঁধ নির্মাণের পর তার রক্ষণাবেক্ষণ নেই। সড়ক নির্মাণের পর মেরামতের বাজেট নেই। এর ফলে নতুন অবকাঠামো দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। একটি সেতু নির্মাণে পাঁচ বছর লাগল, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অর্থ নেই। এটা কোনো উন্নয়ন নয়, এটা সম্পদের অপচয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় একটি বড় সমস্যা হলো, আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর উপর নির্ভরতা। বিশ্ব ব্যাংক, এশিয়া উন্নয়ন ব্যাংক, জাইকা, জিআইজেড — এরা আসে এবং প্রকল্প ডিজাইন করে দেয়। কিন্তু স্থানীয় চাহিদা কতটা বিবেচনা করা হয়? সেই প্রশ্ন থাকে। উপরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া প্রকল্প অনেক সময় কাজ করে না। কারণ স্থানীয় মানুষের সাথে আলোচনা করা হয় না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি জলাশয় উন্নয়ন প্রকল্পে মৎস্যজীবীদের সাথে আলোচনা করা হয়নি। ফলে প্রকল্পটা শেষ হওয়ার পর মৎস্যজীবীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এই ধরনের উদাহরণ অসংখ্য। অবকাঠামো উন্নয়ন গুরুত্বপূর্ণ। দেশকে এগিয়ে নিতে হলে ভালো সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু শুধু নির্মাণ করলেই হয় না। সেগুলোকে টেকসই হতে হবে, সাশ্রয়ী হতে হবে, এবং সবার জন্য সমানভাবে উপকারী হতে হবে। বাংলাদেশে উন্নয়ন হচ্ছে, কিন্তু সেটা সুষম উন্নয়ন নয়। শহর-গ্রাম ভেদ বাড়ছে। ধনী-গরিব ভেদ বাড়ছে। এবং অবকাঠামো অপচয় হচ্ছে। এটা পরিবর্তন করতে হলে দরকার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, এবং স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ।
#উন্নয়ন #অবকাঠামো #বাংলাদেশ #দুর্নীতি #অব্যবস্থাপনা #প্রকল্প #টেকসই উন্নয়ন