29/10/2026
যে স্ত্রী নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে স্বামী-সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়লেন, সেই স্ত্রীকেই কি প্রতিদানে প্রতারণা পেতে হবে? ইসলাম কী বলে এমন স্বামীর ব্যাপারে?
পাঁচ বছর প্রবাসে কাটালেন স্ত্রী, আর তাঁর অনুপস্থিতিতে অন্য নারীকে নিয়ে সংসার সাজালেন স্বামী!
একবার ভাবুন তো, একজন নারী কতটা স্বপ্ন আর বিশ্বাস নিয়ে নিজের স্বামী-সন্তানকে দেশে রেখে প্রবাসে পাড়ি জমান!
পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে, সন্তানের ভবিষ্যৎ সুন্দর করতে এবং স্বামীর পাশে দাঁড়াতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে বিদেশের মাটিতে দিনরাত পরিশ্রম করেন। বুকের ভেতর সন্তানের জন্য হাহাকার নিয়ে, একাকিত্বের কষ্ট সহ্য করে উপার্জিত টাকা পাঠিয়ে দেন স্বামীর কাছে।
তাঁর মনে একটাই স্বপ্ন—
একদিন দেশে ফিরবেন, সন্তানকে বুকে জড়িয়ে ধরবেন, স্বামী-সন্তানকে নিয়ে সুন্দর একটি জীবন গড়বেন।
কিন্তু সেই বিশ্বাসের আড়ালে যদি স্বামী অন্য একজনকে বিয়ে করে নতুন সংসার সাজান, আর স্ত্রীর পাঠানো অর্থ সেই সংসারে ব্যয় করেন, তাহলে ওই নারীর হৃদয়ে কতটা আঘাত লাগতে পারে, তা কি একবারও ভেবে দেখেছেন?
একজন স্ত্রী শুধু অর্থ উপার্জনের যন্ত্র নন; তিনিও একজন মানুষ। তাঁরও ভালোবাসা, সম্মান, নিরাপত্তা ও ন্যায্য অধিকার রয়েছে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, ওই নারীর একটি প্রতিবন্ধী সন্তানও রয়েছে। সন্তানের সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় তিনি বছরের পর বছর প্রবাসে কাটিয়েছেন। অথচ দেশে ফিরে যদি দেখেন, তাঁর স্বামী অন্য স্ত্রীকে নিয়ে চলে গেছেন এবং নিজের ও সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়ার মতো অর্থও তাঁর হাতে অবশিষ্ট নেই, তাহলে সেই কষ্টের ভার বহন করা কতটা কঠিন!
ইসলাম এ বিষয়ে কী শিক্ষা দেয়?
১️⃣ স্ত্রীর সঙ্গে প্রতারণা ও বিশ্বাসভঙ্গ করা কি ইসলামের শিক্ষা?
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দিতে।”
সূরা আন-নিসা, আয়াত ৫৮
স্ত্রী যদি স্বামীর কাছে বিশ্বাস করে অর্থ পাঠান, তবে সেই অর্থের মালিকানা ও ব্যবহারের উদ্দেশ্য বিবেচনা করা জরুরি। অর্থটি যে উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছে, তা উপেক্ষা করে প্রতারণা করা বা অন্যায়ভাবে আত্মসাৎ করা আমানতদারিতার পরিপন্থী।
২️⃣ স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করা স্বামীর দায়িত্ব।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর তোমরা তাদের সঙ্গে সদ্ভাবে জীবনযাপন করো।”
📖 সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৯
একজন স্ত্রীকে বছরের পর বছর অবহেলা করা, তাঁর বিশ্বাসের সুযোগ নেওয়া, তাঁর ন্যায্য অধিকার নষ্ট করা কিংবা তাঁর অসহায়ত্বকে কাজে লাগানো—কোনোটিই উত্তম দাম্পত্য আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
স্ত্রী প্রবাসে থাকেন বলে তাঁর অনুভূতি, মর্যাদা কিংবা অধিকার কমে যায় না।
৩️⃣ একাধিক বিয়ে করা বৈধ, কিন্তু ইনসাফ করা বাধ্যতামূলক।
ইসলামে নির্দিষ্ট শর্ত ও দায়িত্বের অধীনে একাধিক বিয়ের অনুমতি রয়েছে। কিন্তু এই অনুমতি কাউকে প্রতারণা, জুলুম কিংবা স্ত্রীর অধিকার নষ্ট করার ছাড়পত্র দেয় না।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“আর যদি তোমরা আশঙ্কা করো যে, ন্যায়বিচার করতে পারবে না, তবে একজনকেই (বিয়ে করো)।”
📖 সূরা আন-নিসা, আয়াত ৩
অতএব, শুধু দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন বলেই কাউকে অন্যায়কারী বলা যায় না। কিন্তু সেই বিয়ের কারণে প্রথম স্ত্রীর ভরণপোষণ, প্রাপ্য অধিকার কিংবা সন্তানের দায়িত্ব অবহেলা করা হলে তা গুরুতর অন্যায়ের বিষয়।
৪️⃣ অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করা নিষিদ্ধ।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
“তোমরা পরস্পরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করো না।”
📖 সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৮
স্ত্রীর পাঠানো অর্থ যদি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়ে থাকে, আর স্বামী প্রতারণা করে তা আত্মসাৎ করেন বা তাঁর ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত করেন, তাহলে বিষয়টি ইসলামের সম্পদসংক্রান্ত নীতির পরিপন্থী হতে পারে।
তবে অর্থটি উপহার, সংসারের খরচ, নাকি নির্দিষ্ট কোনো আমানত ছিল—তা বিবেচনা করে সঠিক বিধান নির্ধারণ করতে হবে।
যে কথাটি প্রত্যেক স্বামীর মনে রাখা উচিত
আপনার স্ত্রী হয়তো নিজের শখ পূরণ না করে আপনার সংসারের জন্য টাকা পাঠাচ্ছেন।
হয়তো নিজের কষ্ট লুকিয়ে সন্তানের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রবাসে দিন কাটাচ্ছেন।
হয়তো প্রতিদিন মনে মনে ভাবছেন—আর কিছুদিন কষ্ট করি, তারপর দেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে সুখে থাকব।
মনে রাখবেন, কারও বিশ্বাস নিয়ে খেলবেন না। কারও ত্যাগকে নিজের স্বার্থে ব্যবহার করবেন না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সেই ব্যক্তি, যে তার পরিবারের কাছে সর্বোত্তম।”
জামে আত-তিরমিজি, হাদিস ৩৮৯৫।
একজন উত্তম স্বামী শুধু পরিবারের ভরণপোষণ করেন না; তিনি পরিবারের সদস্যদের সম্মান করেন, তাঁদের অধিকার রক্ষা করেন এবং তাঁদের বিশ্বাসের মর্যাদা দেন।
🤲 আর সেই অসহায় নারীর প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী?
তাঁকে দোষারোপ নয়, সহযোগিতা করুন।
তাঁর সন্তানকে অবহেলা নয়, ভালোবাসা দিন।
তাঁর অসহায়ত্ব নিয়ে উপহাস নয়, তাঁর পাশে দাঁড়ান।
কোনো নারী প্রবাসে থাকেন বলে তাঁকে প্রতারণার শিকার হতে হবে—এমন কোনো বিধান ইসলামে নেই।
আল্লাহর কাছে প্রত্যেক মানুষের অধিকার গুরুত্বপূর্ণ। কেউ অন্যের প্রতি জুলুম করলে তার জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
“জুলুম থেকে বেঁচে থাকো। কেননা জুলুম কিয়ামতের দিন বহু অন্ধকারের কারণ হবে।”
সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৫৭৮।
শেষ কথা:
একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর কাছে শুধু অর্থ পাঠান না; অনেক সময় পাঠান নিজের ঘাম, ত্যাগ, ভালোবাসা আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
সেই বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করুন।
মনে রাখবেন, সংসার শুধু টাকায় চলে না; সংসার টিকে থাকে বিশ্বাস, দায়িত্ব, ভালোবাসা ও ইনসাফের ওপর।
যে নারী নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে আপনার পরিবারকে আগলে রাখেন, তাঁর চোখের পানির কারণ হবেন না। তাঁর ত্যাগের মূল্য দিন, তাঁর অধিকার রক্ষা করুন।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে আমানতদার, ন্যায়পরায়ণ ও দায়িত্বশীল জীবনসঙ্গী হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।