02/08/2024
আমার দ্বিতীয় লেখা🥹
কোটা আন্দোলনের শুরু থেকেই আমি আন্দোলনকারীদের পক্ষেই ছিলাম, যদিও আমি আদিবাসী (আমাদের জন্য কোটার বরাদ্দ রয়েছে)।জানা মতে ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার আন্দোলনের পর সেটাও অকার্যকর হয়ে যায়।
তবে একজন ছাত্র হিসেবে আমি বরাবরই চেয়েছিলাম মেধারই জয়লাভ হোক।
জানি মেধা জয়লাভ করলে জুম্ম শিক্ষার্থীদের জন্য তা বড় চ্যালেন্জিং হয়ে দাঁড়াবে।আমি এটাও বলছিনা যে আমাদের সমাজে মেধাবী নেই। কিন্তু পাহাড় আর সমতল লেখার মান, ব্যবস্থা এক নয় এবং যাতায়াতের ও।
আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশই দুর্গম এলাকা। আমি কখনো সাজেক পর্যটনে যাইনি, কিন্তু সেখানে থাকা জনগোষ্ঠীদের জীবনযাপন আমি চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই।
২০১৮-সালে আমি লংগদু উপজেলার বগাচতরে গেছিলাম আমার আজুকে দেখতে এবং আমার বাবা, আমার আজুর(দাদুর) ফেলে আসা (বাধ্য হয়ে পালিয়ে ফেলে আসা ) জায়গা গুলো দেখতে।
সেখানে পৌঁছানো মাত্রই চোখে পড়লো একটি বাজার নাম বৈরাগী বাজার। আমার যতদূর মনে হয় সেই বাজারটিতে ইটের দালান-কৌটাই রাতে দেখা স্বপ্নের মতো।
তারপর আমাকে বলা হলো আমি কিসে যাবো? বললামঃ গাড়িতে করে যাওয়া যায়? কেউ একজন বললেন হ্যাঁ তবে পুরো রাস্তা না অর্ধেক রাস্তা যাওয়া যায়।
আমি আমার বাবা-দাদাদের পুরনো বসতিগুলো দেখার জন্য পুরো রাস্তা হেঁটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। সাথে ছিলো আমার গ্রামের তিন বড়ভাই। আমরা চার ভাই-বোন মিলে হেঁটে গেছিলাম, বাকিদের কেউ গাড়ি করে, আবার কেউ কেউ আমাদের মতো হেঁটে গেছিলো। ঘড়ি ধরে বৈরাগী বাজার থেকে ঐ গ্রামে যেতে ( নাম মনে নেই) প্রায় ঘণ্টার অধিক সময় লেগে যায়। যাওয়ার সময় বয়স্ক কেউ আমাদের সাথে যায়নি তাই চিনতে পারিনি কোনটা কার জায়গা ছিলো😊 অবশ্য ফিরে আসার সময় বাবা আমাকে চিনিয়ে দিয়েছিলেন। আমার বাবা কাকারা যেখানে খেলতেন বিকেল বেলা, সেই মাঠ মাঠের পাড়ে একটি বড় আমগাছ, এখনো রয়েছে। বাবা আমাকে বলতেছিলেন, সেখানে উনারা খেলতেন।
বাজার থেকে কিছুদূর হেঁটে যাওয়ার পর চোখে পড়লো একটি পুরোনো স্কুলঘর (সম্ভবত সেটি জুনিয়র স্কুল),পরে জানতে পারি আমার বাবা সেখানেই প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছিলেন।
যাওয়ার সময় স্কুল চোখে পড়লো, ঘরবাড়ি চোখে পড়লো, কিন্তু সেই বৈরাগী বাজার থেকে ঐ গ্রামে যাওয়ার পথে আর কোথাও দোকান দেখলাম না।
চোখে পড়লো না একটিও হাসপাতাল বা ক্লিনিক বা কোনো ঔষধের দোকানও।
রাস্তাটি কাঁচা রাস্তা ছিল। রাস্তার খানা-খন্ড মেরামত করার নজরদারি নেই। ভাঙা রাস্তায় ব্রিজ নেই, আছে সাঁকো। বাঁশ দিয়ে বানানো সাঁকো।
আমি ছোটবেলা থেকে পড়েছি মানুষের মৌলিক অধিকার ৬টি। তার মধ্যে চিকিৎসা উল্লেখযোগ্য। গ্রামে পৌঁছাতেই আমি সেখানকার মানুষদের প্রশ্ন করলাম, আশেপাশে কোথাও কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক নেই?
উত্তর ছিল, না নেই।
তাহলে তারা জরুরি রোগের চিকিৎসা নিবে কিভাবে বলেন তো?
তাদের জরুরি কোনো অসুখ হলেও বোটে করে ঘণ্টার পথ পাড়ি দিয়ে লংগদু আসা ছাড়া অন্য কোনো রাস্তা নেই। তাহলে তাদের সে চিকিৎসার মৌলিক অধিকারটুকু কোথায়?
সেখানে বিদ্যুৎ নেই, রয়েছে সোলার প্যানেলের ব্যবস্থা তা দিয়ে বড়জোর বাড়িতে আলোর জন্য ২/৩টা লাইট ইউজ করা যায়, তার বেশি আর কিছুই না। নেই কোনো যোগাযোগের সুব্যবস্থা।
সমতলের মানুষ যেখানে এটাস্ট বাথরুম ইউজ করে, সে জায়গায় সেখানকার লোকজন বাড়ি থেকে অনেক দূরে গিয়ে কোনো ছড়া বা ঝিরিতে বা কুয়োতে গিয়ে গোসল করে। পানি পান করার জন্য টিউবওয়েল-এর অভাব (কিছু কিছু বাড়িতে আছে)। তবে প্রায় গ্রামবাসী-ই কুয়োর পানি পান করে।
পার্বত্য অঞ্চলের অধিকাংশ জায়গায় এমন😊
আপনি উপজেলা সদর থেকে ৩/৪কি.মি এর মধ্যেই দেখতে পাবেন এমন জায়গা।
ঠিক তেমন জায়গা থেকে, ঘণ্টার পর ঘণ্টা হেঁটে স্কুলে গিয়ে যারা পড়ালেখা করে, যারা সমতলে গিয়ে তাদের সাথে লেখাপড়ার যোগ্যতা রাখে আমি তাদের স্যালুট করি।
সমতলের স্কুলগুলোতে একই সাবজেক্টের পেছনে কমপক্ষে ২/৩ জন টিচার অবশ্যই থাকেন, সেখানে আমার পাহাড়ে অধিকাংশ স্কুলে ২/৩টা সাবজেক্টই একজন টিচার ক্লাস নেন।
ঠিক সে রকম স্কুলে পড়াশুনা করে যারা দেশের বড় বড় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মেধা তালিকায় ৩ থেকে ৫ হাজারের মধ্যে থাকে, মনে হয়না? তারা সমতলের শিক্ষার্থীদের মতো সুবিধা পেলে মেধা তালিকায় ১০০ জনের মধ্যে না হোক হাজারের ঘরে থাকতো??
তাহলে আমাদের ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী কোটা ৫% থেকে ১%-এ নিয়ে আসা হলো কেন?
আপনারা যারা আমাদের কোটার বিপক্ষে তারা আমার পাহাড়ে এসে আমাদের মতো ১ দিন বসবাস করে দেখান তো, পারেন কিনা।
আমি জোর দিয়ে বলতে পারি, সমতলের কেউ তা পারবেন না।
সুতরাং আমি মনে করি সমতলের কারোর সাথে আমার পাহাড়ের ভাই-বোনদের তুলনা না করে আমাদের পরিশ্রম, আমাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ের মর্যাদা দেওয়া দরকার।
যেটা আমরা পাহাড়ের মানুষেরা কোনোদিন পাইনি, এখনো পাচ্ছি না। বরং আমাদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো আমাদের কোটা ৪% কমিয়ে দিয়ে।
২০২২ সালের জনশুমারির প্রাথমিক প্রতিবেদন মতে, তিন পার্বত্য জেলা তথা খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি এবং বান্দরবান জেলার মোট জনসংখ্যা ১৮৪২৮১৫ জন। এর মধ্যে বাঙালি ৯২২৫৯৮ (৫০.০৬%) জন এবং অবাঙালি/ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী ৯২০২১৭ (৪৯.৯৪%) জন।
যেখানে পাহাড়ে ৯ লক্ষাধিক মানুষ পাহাড়ি সেখানে আমাদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে কোটা ১% নামিয়ে আনাকে আমি রীতিমতো অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া বলবো।
আমি ছাত্রদের সংহতি জানাই তবে আমাদের ৫% কোটাটা পুনর্বহালের দাবি রেখে।
Copy by turni chakam post
#