21/07/2026
#চাঁদের_আলো_তুমি
#মাহজুবা_আক্তার_শাম্মী
(কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ)
পর্ব:৯
রাতের খাবার শেষ করে সবাই একটু বিশ্রাম নিল। এরপর নোভা, নিধি, নিহান ও নিভান—এই চার ভাই-বোন মিলে গল্প করতে করতে তিন তলার দিকে উঠতে লাগল। সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে নোভা কোমর ধরে ক্লান্ত গলায় বলে উঠল,
: বাবা গো এতগুলো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে উঠতে তো আমার পেটের সব খাবার এখনই হজম হয়ে গেল।
নোভার কথা শুনে সবাই হেসে ফেলল, শুধু নিভান ছাড়া। নিভান আগের মতোই গম্ভীর রইল। নিহান নোভার কথায় খোঁচা দিয়ে বলল,
: তোর যদি এতই কষ্ট হয়, তবে তুই নিচে রান্নাঘরের পাশে শিফট হয়ে যা। তারপর পাতিলের সামনে শুধু বসে থাকবি, আর যখনই খিদে পাবে গপাগপ গিলবি।
নিধি নোভার পক্ষ নিয়ে মুখ কুঁচকে বলল,
: ও নিচে যাবে কেন শুনি? দরকার হলে আমি ওর জন্য নিচ থেকে আবার খাবার নিয়ে আসব। ও নিচে চলে গেলে তো আমার পড়াশোনাই হবে না। তখন আমার নিজেরই নিচে-উপরে করতে করতে খিদে লেগে যাবে।
নিধির ওকালতি দেখে আবারও সবার মাঝে হাসাহাসি শুরু হয়ে গেল। নিহান হেসে বলল,
: তাহলে তোরা দুই বোনই নিচে চলে যা।
ঠিক তখনই নিভান বেশ শক্ত একটা ধমক দিয়ে উঠল। নিহান নিভানের ধমক খেয়ে হেসে ফেলে নিধিকে জিজ্ঞেস করল,
: আচ্ছা নিধি, এই বাড়ির সবার বড় কে? আমি নাকি নিভান?
নিধি অবাক হয়ে বলল,
: কেন, তুমিই তো বড়। ভুলে গেলে নাকি?
নিহান তখন নিভানের দিকে ইশারা করে বলল,
: তাহলে এই ধমকটা কাকে দিল নিভান? আমাকে?
নিভান এবার রাগে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
: হ্যাঁ হ্যাঁ, তোমাকেই দিলাম। এখন ফালতু কথা না বাড়িয়ে চলো তো।
[পরের দিন সকাল]
পরের দিন সকালবেলা নোভা যথারীতি ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়ে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত করল। পড়া শেষ করে সে নিজের পড়ার টেবিলে বই নিয়ে বসল। পরীক্ষা যত কাছে আসছে, নোভার মনের ভেতরের টেনশন তত বাড়ছে। আজ স্কুলে ওদের শেষ ক্লাস, বিদায় বেলা। তাই আজ একটু সকাল সকালই যেতে হবে। নোভার মনটা ভীষণ খারাপ; আর কখনো ক্লাসের বন্ধুদের এভাবে একসাথে দেখতে পারবে না সে। তার কেবলই মনে হচ্ছে, এই তো সেদিনের কথা—কখন ষষ্ঠ শ্রেণীতে ভর্তি হলো আর কখন যে দশম শ্রেণীর পাঠ চুকিয়ে বিদায়ের সময় চলে এলো, সে টেরই পেল না।
নোভা পড়া শেষ করে দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে নেমে এলো। রেনু শেখ ওকে তাড়াহুড়ো করতে দেখে বললেন,
: কিছু খেয়ে যাবি না রে মা? সারাদিন না খেয়ে থাকবি কী করে?
নোভা জুতো পরতে পরতে বলল,
: বড় আম্মু, আমি স্কুলেই কিছু একটা খেয়ে নিব, তুমি চিন্তা কোরো না।
এই বলে সে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
সকাল তখন ৯টা বাজে। একে একে পরিবারের সবাই এসে খাবার টেবিলে উপস্থিত হলো। সবাই যার যার নির্দিষ্ট চেয়ারে বসে পড়লেও নোভার চেয়ারটা আজ খালি পড়ে রইল। নিভান টেবিলে এসেই নোভার খালি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে একটু ভ্রু কুঁচকাল। সে নিহানের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাতেই নিহান মায়ের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করল,
: আম্মু, নোভা কোথায়? নোভাকে তো টেবিলে দেখছি না।
রেনু শেখ খাবার বেড়ে দিতে দিতে বললেন,
: ও তো সকালেই স্কুলে চলে গেছে। আজকে ওদের লাস্ট ক্লাস, তাই স্যার ফোন দিয়ে একটু আগেই ডেকেছিলেন। মেয়েটা তাড়াহুড়োয় সকাল থেকে কিছু মুখেও দিয়ে যায়নি।
'কিছু খেয়ে যায়নি'—কথাটা শুনতেই নিভানের মেজাজটা এক নিমেষে বিগড়ে গেল। অথচ আজ কলেজে তার প্রথম জয়েনিংয়ের দিন, মনটা ভালো থাকার কথা ছিল। সে কোনোমতে খাওয়ার কাজটা শেষ করল। তারপর টেবিলের সবাইকে বিদায় জানিয়ে নিভান কলেজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেল। নিহানও নিজের অফিসের দিকে রওনা হলো এবং বাড়ির বাকি কর্তারাও যার যার কর্মস্থলের দিকে চলে গেলেন।
ওদিকে ছোট চাচা রফিকুল শেখ আজ সকাল থেকে ওনার স্ত্রী রুপা শেখের সাথে একটা টু শব্দও করেননি। ওনার আত্মসম্মান আর রুচিতে বাঁধছে এমন এক কুটিল মহিলার সাথে কথা বলতে। তবে ওনার মনটা ভালো হয়ে গেল নিজের মেয়ে নিধিকে দেখে। যাক বাবা, মেয়েটা মায়ের অন্যায়ের কষ্ট নিজের মনে চেপে রেখে মুখ কালো করে রাখেনি, এটাই অনেক।
রফিকুল শেখ অফিস যাওয়ার আগে মেয়ে নিধির দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করলেন,
: তা আম্মুজান, আজকে কি তুমি আমাদের সাথে গাড়িতে যাবে নাকি?
নিধিও বাবার কথায় তাল মিলিয়ে হেসে বলল,
: গাড়িতে যদি আমার বসার মতো একটু জায়গা হয়, তাহলে অবশ্যই যাব।
ঠিক তখনই নোভার আব্বু রফিক শেখ নিজের গলাটা একটু পরিষ্কার করে রসিকতা করে বললেন,
: উঁহু, গাড়িতে কোনো জায়গা হবে না। আমরা সবাই মাশাল্লাহ বেশ মোটা-সোটা মানুষ, একটুও জায়গা খালি থাকবে না।
নিধি দমে না গিয়ে চটপট জবাব দিল,
: জায়গা না হলেও সমস্যা নেই, আমি তোমাদের গা ঘেঁষেই চলে যাব।
নিধির এমন জবাব শুনে বাড়ির সবাই হো হো করে হেসে ফেলল। মনে মনে সবাই হাফ ছেড়ে বাঁচল যে, যাক বাবা, কাল রাতের অপ্রীতিকর ঘটনাটা কেউ মনের ভেতর চেপে ধরে রাখেনি সবাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে, এটাই অনেক বড় পাওয়া। এরপর বাড়ির পুরুষেরা সবাই যে যার কর্মক্ষেত্রের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে গেলেন।
[দুপুরবেলা, নোভার স্কুল]
দুপুরের দিকে ক্লাসের ফাঁকে নোভা আর তার বান্ধবী মুন্নি একসাথে ক্যান্টিনের দিকে বের হলো। মুন্নির মা বেশ অসুস্থ, তাই সে ক্যান্টিনে দ্রুত খাওয়া শেষ করে বাড়ি চলে যাবে। আর ক্লাসের প্রয়োজনীয় নোটগুলো কোচিংয়ের সময় শেষ হলে মুন্নির ভাই এসে নোভার কাছ থেকে নিয়ে যাবে।
নোভার আজ সকাল থেকেই মনটা ভালো নেই, তাই সে কিছুই খাবে না বলে ঠিক করেছে। মুন্নি কেবল নিজের জন্য খাবারের অর্ডার দিল, ঠিক তখনই কোথা থেকে একটা অপরিচিত ছেলে হন্তদন্ত হয়ে দৌড়ে এসে নোভার সামনে দাঁড়াল। ছেলেটি নোভার হাতে একটা খাবারের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
: ভাবি, এটা ভাইয়া পাঠিয়েছেন। আপনি নাকি সকালে না খেয়েই চলে এসেছেন, তাই এটা ওনার স্পেশাল অর্ডার।
কথাটা শোনামাত্রই নোভা আর মুন্নি দুজনেই চরম চমকে উঠল। নোভা সকালে কিছু খেয়ে আসেনি—এই খবর স্কুলের বাইরের একটা ছেলে কী করে জানল? নোভা কপালে ভাঁজ ফেলে বেশ কড়া গলায় ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করল,
: আচ্ছা, তো আপনার সেই মহান ভাইয়ের নামটা কী শুনি? আর ওনার মাথায় কি কোনো বড়সড় সমস্যা আছে নাকি?
ছেলেটি দাঁত বের করে হেসে বলল,
: না ভাবি, ভাইয়ের নাম বলা যাবে না। আর ভাইয়ের কোনো সমস্যা নেই, আলহামদুলিল্লাহ সব একদম ঠিকঠাক আছে। আপনি একদম চিন্তা করবেন না।
'চিন্তা করবেন না' শুনে নোভার মেজাজ আরও চড়ে গেল। সে চোখ রাঙিয়ে বলল,
: এই যে শুনুন, আপনাকে কে বলল যে আমি ওনার জন্য চিন্তা করছি, হ্যাঁ? ফাজিল লোক একটা।
নোভা একটু থেমে আবার গাল ফুলিয়ে বলল,
: আপনার সেই ভাইকে গিয়ে বলবেন, কোনো ভালো গরুর ডাক্তার দেখাতে। ওনার চোখে নির্ঘাত সমস্যা আছে, ওনাকে একটা গরুর চশমা দেওয়া দরকার। আর তা যদি না হয়, তবে মাথায় একটু সমস্যা আছে বলে গরুর ইনজেকশন দেওয়া উচিত।
বান্ধবী নোভার মুখে এমন অদ্ভুত ও চরম হাসির কথা শুনে মুন্নি তো হেসেই খুন হাসতে হাসতে তার পেটে খিল ধরার জোগাড়—বলল তো বলল, কী না 'গরুর ডাক্তার'🤣
ওদিকে নোভার এমন কড়া কড়া কথা শুনে ছেলেটির মুখটা আমসি হয়ে গেল। সে শুকনো মুখে বলল,
: ভাবি, খাবারটা অন্তত রাখুন। আমার এবার যাওয়ার সময় হয়েছে।
নোভা হাত গুটিয়ে গম্ভীর মুখে বলল,
: খাবার যেহেতু আমার জন্য এনেছেন, তাহলে আমি যা বলব, তা তো আপনাকে শুনতেই হবে, তাই না?
ছেলেটি নিরুপায় হয়ে মাথা নেড়ে বলল,
: হ্যাঁ, শুনব।
নোভা স্কুলের গেটের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল,
: ওই যে গেটের সামনে একটা গরিব মহিলা ছোট বাচ্চা নিয়ে বসে আছে না? যান, খাবারটা উনাকে দিয়ে আসেন।
ছেলেটি নোভার কথা শুনে বিস্ময়ে হাঁ করে নোভার দিকে তাকিয়ে রইল। তাই দেখে নোভা ধমকের সুরে বলল,
: হাঁ টা এবার বন্ধ করুন তো! বাতাসে অনেক মশা-মাছি উড়ছে, মুখে ঢুকে যেতে পারে। আমার পেট এমনিতেই ভরা, এই খাবার দিয়ে আমি নিজের পেট নষ্ট করতে চাই না। যান, খাবারটা উনাকে দিয়ে আসুন।
নোভার এমন কড়া হুকুম শুনে ছেলেটি আর কোনো কথা না বাড়িয়ে সুড়সুড় করে গিয়ে গেটের সেই মহিলাকে খাবারের প্যাকেটটা দিয়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় সে নিজের কপাল চাপড়ে মনে মনে বলতে লাগল—'আল্লাহ রে! এ আমি কার পাল্লায় পড়লাম? কোন খ্যাপাটে ভাবির চক্করে এসে ফেঁসে গেলাম।
কিছুক্ষণ পর মুন্নি নিজের খাওয়া শেষ করে নোভার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে মনে করিয়ে দিয়ে গেল—'কোচিং শেষ হলে ভাইয়া আসবে কিন্তু, তুই নোটগুলো একটু কষ্ট করে ওর হাতে দিয়ে দিস।
চলবে --------------
ভুল হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন লাইক কমেন্ট শেয়ার করে পাশে থাকবেন ধন্যবাদ