02/04/2026
১৯৮২ সালের একটি ভয়ানক যৌন নির্যাতনের মামলায় ভুল করে দোষী সাব্যস্ত হয়েছিলেন স্টিভেন ফিলিপস। নির্দোষ একজন মানুষের জীবন থেকে চুরি হয়ে গিয়েছিল চব্বিশটি দীর্ঘ বছর। টেক্সাসের কারাগারের অন্ধকার সেলে কাটিয়েছেন তিনি যন্ত্রণায় ভরা সেই সময়।
তারপর ২০০৮ সালে এলো সত্যের জয়। ডিএনএ প্রযুক্তির অকাট্য প্রমাণে তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ প্রমাণিত হলেন এবং মুক্তি পেলেন। দীর্ঘ অন্যায়ের ক্ষতিপূরণ হিসেবে টেক্সাস অঙ্গরাজ্য সরকার তাকে প্রায় ৬ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় তখনকার হিসাবে প্রায় ৭০ কোটি টাকার মতো) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। এই অর্থ ছিল তার হারানো স্বাধীনতা, ভাঙা স্বপ্ন আর অবর্ণনীয় মানসিক-শারীরিক যন্ত্রণার কিছুটা প্রতিদান।
কিন্তু এখানেই গল্পের মোড় ঘুরল।
ফিলিপস যখন কারাগারে ছিলেন, তখনই তার স্ত্রী তাকে ডিভোর্স দিয়ে চলে গিয়েছিলেন। মুক্তির পর ক্ষতিপূরণের খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রাক্তন স্ত্রী (ট্রেসি টাকার) আদালতে গিয়ে দাবি করলেন—এই বিপুল অর্থের একটা অংশ তারও প্রাপ্য। তার আইনজীবীর যুক্তি ছিল: ফিলিপস যখন জেলে ছিলেন, তখনও তাদের বিবাহিত সম্পর্ক আইনত বজায় ছিল। তাই এই ক্ষতিপূরণ ‘কমিউনিটি প্রপার্টি’ বা যৌথ সম্পত্তির আওতায় পড়ে। তারা বললেন, এই টাকা আসলে হারানো উপার্জনের বিকল্প—যা স্বামী-স্ত্রীর যৌথ অধিকার।
একটি নাটকীয় আইনি লড়াই শুরু হল। নিম্ন আদালতে প্রথমে প্রাক্তন স্ত্রী কিছু অর্থ পেয়েও গিয়েছিলেন। কিন্তু ফিলিপস আপিল করলেন।
অবশেষে ২০১৪ সালে টেক্সাসের অ্যাপিলেট আদালত (৫ম ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট অব অ্যাপিলস) এক ঐতিহাসিক রায় দিলেন। বিচারকরা স্পষ্টভাবে বললেন—না।
তারা যুক্তি দিলেন: টেক্সাসের টিম কোল অ্যাক্ট অনুযায়ী এই ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে শুধুমাত্র ভুল করে কারাবাসের বছরের ভিত্তিতে—প্রতি বছরের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণ (তখন ৮০,০০০ ডলার)। এটি কোনো ‘হারানো বেতন’ বা আয়ের বিকল্প নয়। বরং এটি ব্যক্তিগত আঘাত (Personal Injury)-এর ক্ষতিপূরণ। ফিলিপসের স্বাধীনতা হরণ, তার শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা, তার জীবন থেকে চুরি হয়ে যাওয়া সময়—এসবের প্রতিদান।
আইন অনুসারে, ব্যক্তিগত আঘাতের ক্ষতিপূরণ বিবাহিত দম্পতির যৌথ সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হয় না। এটি সম্পূর্ণভাবে আহত ব্যক্তির নিজস্ব। আদালত আরও বললেন, আইনে স্ত্রী বা প্রাক্তন স্ত্রীর জন্য কোনো আলাদা ক্ষতিপূরণের বিধান নেই (শুধু অপরিশোধিত শিশু ভরণপোষণের জন্য কিছু ব্যবস্থা আছে, যা তিনি আগেই পেয়েছিলেন)।
ফ্যামিলি ডিস্ট্রিক্ট জজ থেকে শুরু করে উচ্চ আদালত—সবাই শেষ পর্যন্ত একই সিদ্ধান্তে পৌঁছালেন: স্টিভেন ফিলিপসের প্রাক্তন স্ত্রী এই ক্ষতিপূরণের এক কানাকড়িও পাবেন না।
এই রায় শুধু একজন নির্দোষ মানুষের জন্য ন্যায়বিচারই নয়, বরং একটি বড় বার্তাও দেয়—ক্ষতিপূরণ যখন কারও ব্যক্তিগত যন্ত্রণা ও স্বাধীনতার জন্য, তখন তা তারই একান্ত নিজস্ব। জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় কেড়ে নেওয়ার পর যে টাকা আসে, তা অন্য কারও দাবির খেলনা হতে পারে না।
স্টিভেন ফিলিপসের গল্প অন্যায়, সংগ্রাম আর শেষ পর্যন্ত সত্যের জয়ের এক শক্তিশালী উদাহরণ।