13/04/2026
সমস্যা আসলে কোথায়?
সমস্যাটা সংবিধানে নাকি, সমস্যাটা তার প্রয়োগে**
বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বিতর্কে “সংস্কার” বনাম “সংশোধন”—এই দুই শব্দের লড়াই যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রশ্ন আড়ালে রয়ে যাচ্ছে: আসল সমস্যা কোথায়? সংবিধানের কাঠামোয়, নাকি তার বাস্তব প্রয়োগে?
আমার অবস্থান পরিষ্কার—সমস্যাটা মূলত সংবিধানে নয়, সমস্যাটা তার কার্যকরে।
বাংলাদেশের সংবিধান নাগরিক অধিকার, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক কাঠামোর একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা প্রদান করে। সেখানে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আছে, ভোটাধিকারের নিশ্চয়তা আছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলা আছে। কাগজে-কলমে এই কাঠামো দুর্বল নয়। তাহলে প্রশ্ন আসে—কেন বাস্তবে এত সংকট?
সমস্যার মূল জায়গা হলো প্রয়োগ। সংবিধান যতই শক্তিশালী হোক, যদি তার বাস্তবায়ন সঠিকভাবে না হয়, তাহলে সেটি কেবল একটি দলিল হয়েই থাকে। নাগরিক অধিকার তখন কাগজে সীমাবদ্ধ থাকে, বাস্তবে প্রতিফলিত হয় না।
আজকের বাস্তবতায় আমরা দেখতে পাই—নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে সন্দেহ, এবং জবাবদিহিতার ঘাটতি। কিন্তু এই সমস্যাগুলো কি সংবিধানের ভাষায় আছে? নাকি এগুলো সৃষ্টি হয়েছে তার অপপ্রয়োগের মাধ্যমে?
এই জায়গায় “সংশোধন” এর যুক্তি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কারণ, যদি কাঠামো মোটামুটি ঠিক থাকে, তাহলে সেটিকে ভেঙে নতুন কিছু গড়ার চেয়ে বরং এর ভেতরের দুর্বলতাগুলো ঠিক করাই বেশি বাস্তবসম্মত। বড় ধরনের “সংস্কার” প্রায়ই অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যেখানে রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ঝুঁকির মুখে পড়ে।
তবে এটাও সত্য যে, শুধুমাত্র প্রয়োগের কথা বলে সব সমস্যাকে আড়াল করা যাবে না। যদি কোনো কাঠামো বারবার একই ধরনের অপব্যবহারের সুযোগ দেয়, তাহলে সেটিও প্রশ্নের মুখে পড়তে বাধ্য। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর সবসময় “পুরোটা বদলে ফেলা” হতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পথ হতে পারে একটি ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি—যেখানে সংবিধানের মূল কাঠামো অক্ষুণ্ণ রেখে প্রয়োগের জায়গায় কঠোরতা আনা হবে, এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সীমিত সংশোধন করা হবে।
কারণ রাষ্ট্র পরিচালনা কোনো পরীক্ষাগার নয়, যেখানে প্রতিনিয়ত বড় বড় পরীক্ষামূলক পরিবর্তন আনা যায়। এখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে কোটি মানুষের জীবনে। তাই আবেগ নয়, প্রয়োজন বাস্তবতা এবং স্থিতিশীলতার মধ্যে সমন্বয়।
শেষ পর্যন্ত, একটি রাষ্ট্রের শক্তি তার সংবিধানে নয়, বরং সেই সংবিধান কতটা ন্যায়সংগতভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে—সেখানেই নিহিত। বাংলাদেশ আজ সেই পরীক্ষার মুখোমুখি, যেখানে প্রমাণ করতে হবে—সমস্যা কাঠামোয় নয়, সমস্যার মূল তার ব্যবহারে।