15/03/2026
আমার স্বামী আজ অফিস থেকে ঈদের বেতন বোনাস পেয়েছে। হাতে টাকা পেয়েই উনি আমাকে দুপুরে এসে বললো, "ঈদ তো চলে এসেছে ঐশী। চলো আজ মার্কেটে যাই, সবার জন্য কেনাকাটা সেড়ে ফেলি।"
আমি বললাম, এখন বাহিরে প্রচন্ড রকমের রোদ। রোজা রেখে এতো গরমের মধ্যে বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না আমার। তুমি একাই যাও না।"
"তুৃমি না গেলে হবে না-কি? তুমি দেখেশুনে সবার জন্য কিনবে।"
অগত্যা বরের কথায় যেতেই হলো। মার্কেটে এসে শ্বাশুড়ির জন্য ঈদের শাড়ী কিনতে এসে আমার চোখ আঁটকে যায় তার পাশের খয়েরী রঙের শাড়ীটার উপর। এই রঙটা আমার মায়ের খুব পছন্দের। কিন্তু মুখ ফুটে বরকে বলার সাহস হলো না। আমি শাড়ীটা হাতে নিয়ে বারবার নড়াচড়া করছি। এরিমধ্যে শ্বাশুড়ির জন্য নিদিষ্ট একটা শাড়ী কিনলো বর। সেটাও আমার পছন্দ অনুযায়ীই হলো। উনি দোকানী'কে টাকা দিয়ে অন্য দোকানে যাবে বাকি কেনাকাটা করতে।
কিন্তু আমি এখনো শাড়ীটা হাতে নিয়ে বসে আছি। মায়ের জন্য এই শাড়ী কিনতে মন চাচ্ছে খুব। শাড়ীটা রেখে চলে যেতে ইচ্ছে করছে না আমার। যা দেখে উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলো, "তুমি কি ওই শাড়ীটা নিবে ঐশী? তোমার পছন্দ হয়েছে?"
আমি আমতা আমতা করে বললাম, "এই রঙটা আমার মা খুব পছন্দ করে। মায়ের গায়ে এই শাড়ীটা বেশ মানাবে।"
আমার মায়ের কথা বলতেই বর মুখ বিকৃত করে ফেললো। এরপর আমাকে তাড়া দিয়ে বললো, "ওটা রেখে দেও এখন। আমাদের এখনো অনেক কেনাকাটা বাকি। চলো অন্য দোকানে যাই। রুমকি (ননদ) বলেছে তার পাকিস্তানি ড্রেস চা'ই চাই। নয়তো তার নাকি ঈদই হবে না।"
উনার কথা শুনে মনেমনে ভীষণ কষ্ট অনুভব হলো আমার। মায়ের জন্য অতী পছন্দের শাড়ীটা রেখেই উঠতো হলো আমাকে৷ উনি উনার মা-বোন সবার কথা ভাবলো। আমার বাড়িতেও বৃদ্ধ মা-বাবা আর ছোট একটা বোন রয়েছে। ওদের কথা একবার মনেও করলো না। উনার কতো তাড়া নিজের ফ্যামিলির জন্য। আসলেই যার যার তার তার। আজ খুব টাকার অভাব বোধ করছি আমি।
মেয়েদের পুরোপুরি স্বামীর উপর নির্ভরশীল হওয়ার চাইতে নিজের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত। আজ আমিও যদি কিছুটা ইনকাম করতে পারতাম, হয়তো শখের জিনিস গুলো আমিও আমার মা-বাবা, বোনকে দিতে পারতাম। আমি মেয়ে তা-ও ঈদ আসলে আমার বাবা-মা বোনকে কিছু দিতে ইচ্ছে করে। ভালো-মন্দ খাওয়াতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আমার স্বাদ আছে কিন্তু স্বাধ্য নাই।
চা'পা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ততক্ষণাৎ শাড়ীটা রেখে লজ্জিত মুখে উঠে দাঁড়ালাম আমি।
বর আগে আগে হাঁটছে। আমার এই গোপন ব্যথা উপলব্ধি করতে পারলো না মানুষটা আর না চেষ্টা করছে। ব্যথিতো মুখ নিয়ে আমিও উনার পিছনে পিছনে হাঁটছি। ননদের জন্য ড্রেস কিনতে এসে আমারও ইচ্ছে হলো, ছোট বোনটার জন্য কিছু একটা কিনতে। কিন্তু এবার আর সেই একই ভুল করলাম না। প্রকাশ করলাম না কিচ্ছুটি। যদি কখনো সম্ভব হয়, নিজের টাকা দিয়ে আমি ওদের জন্য মন ভরে কিনবো। সেদিন আর কারো কাছে হাত পাততে হবে না।
বর বেশ দাম দিয়ে তার বোনের জন্য একটা ড্রেস কিনলো। এরপর একে একে তার ফ্যামিলির সবার জন্য কেনাকাটা শেষ করলো। এরমধ্যে একটিবার আমার পরিবারের কথা মনেও করলো না লোকটা। লজ্জায় দ্বিধায় আমিও আর ওদের প্রসঙ্গ তুললাম না।
সবার শেষে এবার আসলো আমার পালা। উনি আমাকে জিজ্ঞেস করলো,
"তুমি কি কিনবে ঐশী? তোমার পছন্দ মতো যা ইচ্ছে একটা কিছু কেনো।"
আমি ততক্ষণাৎ বললাম, "আমার কিছু লাগবে না। অনেকটা বেলা হয়ে গিয়েছে, চলো এবার বাসায় যাই আমরা। আমার বড্ড ক্লান্ত লাগছে।"
"তা হয় না-কি। সবার জন্য এতো কিনলাম, আর তুমি কিনবে না? কিছু তো একটা নেও।"
"আমি না হয় পরে কিনবো। আমার বড়ো মাথা ধরেছে। চলো এবার বাসায় যাই।"
আসলে এটা ছিলো আমার একটা অযুহাত মাত্র। যে শাড়ী আমি আমার মায়ের জন্য কিনতে পারলাম না, টাকার জন্য। ওদের রেখে নিজের জন্য নতুন পোশাক কেনার মতো উচচ্ছাস আমার ভিতরে কাজ করছে না। এরপর বরও আর জোড়াজুড়ি করলো না আমায়।
বাসায় এসে সবার শপিং বুঝিয়ে দিলাম। শ্বাশুড়ি মা একে-একে সব দেখলো। নিজের শাড়ীটা হাতে নিয়ে উলটো-পালটা করে দেখছে। তার ছেলে উনাকে জিজ্ঞেস করলো,
"মা, তোমার শাড়ী পছন্দ হয়েছে?"
"হ্যাঁ, শাড়ীটা ভীষণ সুন্দর।"
এরা মা-ছেলে শপিং নিয়ে কথা বলছে। এক ফাঁকে আমার শ্বাশুড়ি তার ছেলেকে জিজ্ঞেস করলো,
"আমাদের সবার জন্য তো আনলি, তোর শ্বশুর-শ্বাশুড়ির জন্য কিছু আনছিস?"
"না উনাদের জন্য কিছু আনিনি, মা। উনাদের তো গতবছর ঈদেও দিয়েছি। এবার হাতে টাকা-পয়সা বেশি একটা নেই।"
আমার বাবা-মা'কে নিয়ে স্বামীর এরকম অনীহা মূলক মন্তব্য শুনে চোখ ভিজে উঠলো আমার। কান্না লুকাতে দ্রুত ওখান থেকে নিজের রুমে চলে গেলাম আমি। রুমে আসতেই ছোট বোনের কল। বোন উসখুস মুখে আমায় জিজ্ঞেস করলো,
"আপু তোরা না-কি শপিং গিয়েছিলি আজ?"
"হ্যাঁ গিয়েছি তাতে তোর কি?"
বোনকে বেশ শক্ত কণ্ঠে বললাম কথাটা আমি। আমার কথা সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে বোন বললো,
"আমার জন্য কিছু আনছিস আপু?"
বোনের কথায় কোনো জবাব দিতে পারলাম না আমি। আমার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে কেবল নিরব অশ্রু। এক আকাশ সমান চাপা ব্যথা নিয়ে ততক্ষণাৎ ফোন কেটে দিলাম আমি। আমার এই গোপন ব্যথা, নিরব অশ্রুর য'ন্ত্র'ণা আঁটকে থাকলো চার দেয়ালের মাঝে।
(সমাপ্ত)
#নিরব_অশ্রু
লেখনীতেঃ #সুমাইয়া_আফরিন_ঐশী
(গল্পটি কেমন লাগছে জানাবেন।)
[রি-পোস্ট [