Rafid Al Zahur

Rafid Al Zahur Based in Dhaka, Bangladesh

04/06/2026

বৃষ্টির মধ্যে বেড়ালরা সাধারণত কোথাও লুকিয়ে থাকে। দোকানের টিনের চালের নিচে, গ্যারেজের ভেতরে কিংবা ড্রেনের পাইপে গুটিসুটি মেরে বসে থাকে। কিন্তু এই বেড়ালটা লুকায়নি।

সাদা ধবধবে একটা বেড়াল বসে আছে একদম রাস্তার মাঝখানে। দূর থেকে হার্ড ব্রেক চাপলেন ট্রাক ড্রাইভার শামসুল সর্দার।

ঢাকার রাস্তায় মাঝরাতে মানুষ গাড়ি থামাতে চায় না; বিশেষ করে বৃষ্টির রাতে। সমস্যা হতে পারে। ছিনতাই হতে পারে। পুলিশ ঝামেলা করতে পারে। ব্রেক চেপেই শামসুল ড্রাইভার তাই খুব বিরক্ত হলেন।

সময়টা ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাস। ঢাকায় সেদিন এক অদ্ভুত বৃষ্টি নেমেছে। ফেব্রুয়ারি মাসে ঝুম বৃষ্টি! এই সময়ের বৃষ্টিতে কেন জানি সব কিছুর একটা গন্ধ ছড়ায়। কাঠের ওপর বৃষ্টি পড়লে এক রকম গন্ধ, মাটির ওপর পড়লে আরেক রকম গন্ধ, আবার পিচঢালা রাস্তায় পড়লে অন্য আরেক গন্ধ।

রাত ২টা ১৭। মানিকগঞ্জ থেকে কারওয়ান বাজার ট্রাক চালিয়ে মাল নিয়ে যাচ্ছেন শামসুল ড্রাইভার। ঐ যে সব ট্রাকের গায়ে লেখা থাকে, “সমগ্র বাংলাদেশ ৫ টন”।

শামসুল সর্দারের বয়স ৫৩। ৩৪ বছর রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছেন। শুরুতে ‘মুড়ির টিন’ চালাতেন। এরপর মিনিবাস। গত ২১ বছর ধরে ট্রাক চালাচ্ছেন। শামসুল ড্রাইভারের জীবনের বেশিরভাগ সময় কেটে গেছে হাইওয়েতে পুরোনো হিন্দি গান শুনতে শুনতে।

শামসুল সর্দার প্রথমে ভেবেছিলেন, সাদা কোনো পলিথিনের বস্তা। হেডলাইটের আলো কাছে আসার পর তিনি দেখলেন, না বস্তা না; একটা সাদা বেড়াল রাস্তার ঠিক মাঝখানে বসে আছে। অগত্যা তাঁকে হার্ড ব্রেক করতে হল।

বার কয়েক জোরে হর্ণ বাজল। বেড়ালটা এক বিন্দুও নড়ল না। সাধারণ নিয়মে ড্রাইভারের এখন ট্রাকটাকে এক সাইড দিয়ে টেনে বের হয়ে যাওয়ার কথা। শামসুল সর্দার সেটাই চেষ্টা করলেন।

কিন্তু দেখা গেল, বেড়ালটা জ্যামিতি জানে। সে বসে আছে রাস্তার একদম ঠিক মাঝখানে। এত বড় ট্রাকের পক্ষে তাকে পাশ কাটিয়ে বের হওয়া সম্ভব না।

ট্রাক লাইনে ড্রাইভার হচ্ছেন ‘ওস্তাদ’। আর তাঁর হেল্পার হচ্ছে ড্রাইভারের ‘পাইটু’। শামসুল সর্দারের পাইটুর নাম পল্টু।

ঠিক এই মুহূর্তে পল্টু মুখ হা করে ঘুমোচ্ছে। এত বড় হার্ড ব্রেকের পরও তাঁর মুখ বন্ধ হয়নি।

শামসুল সর্দার পল্টুর পাছায় একটা কষে লাথি মারলেন। হুরমুর করে উঠে পল্টু বলল,

— ওস্তাদ, পুলিশে আবার চান্দা চায় নাকি?

— শুয়োরের বাচ্চা, ওঠ। রাস্তায় নাইমা বিলাই সরা। হর্ণ দিতাসি, হালার পো কি বয়রা বিলাই নাকি! নাম নিচে নাম, আইলশা কোনহানের।

পল্টু তাঁর ওস্তাদকে খুব ভয় করে। শামসুল ড্রাইভার কখনো দরকারের বেশি কথা বলেন না। এদিকে পল্টু একজন প্রথিতযশা বাচাল।সে সারাদিন কথা বলে।

শামসুল সর্দার পল্টু'র বেশিরভাগ কথার কোনো জবাব দেন না। পল্টু ১০টা কথা বললে, শামসুল ড্রাইভার ১টা উত্তর দেন। সেই উত্তরও হয় খুবই সংক্ষিপ্ত এবং সাধারণত একটাই কথা: “শুওরের বাচ্চা, চোপ।”

গত ৩ মাস হল পল্টু শামসুল সর্দারের সাথে আছে। সে শুনেছে, শামসুল ড্রাইভারের স্ত্রী পাগল। স্ত্রী থাকেন তাঁর বাপের বাড়ি। তাঁদের একটা ছেলে ছিল। নাম জুম্মন। ২০১২ সালে ডেঙ্গুতে সে মারা যায়। জুম্মনের বয়স ছিল ৯ বছর।

ড্রাইভারদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত আছে। “রাস্তায় মানুষ বয়সে বুড়া হয় না।” এর মানে, যতক্ষণ গাড়ি চলে ততক্ষণ বয়স থমকে থাকে। এ জন্য ড্রাইভাররা পুরোটা জীবন একটা কিশোর মন নিয়ে কাটিয়ে দেন।

জুম্মন মারা যাওয়ার আগে নাকি শামসুল সর্দারও কিশোর ছিলেন। ড্রাইভিং লাইনে ফুর্তিবাজ হিসেবে তাঁর ব্যাপক সুনাম ছিল। যতক্ষণ ট্রাক চালাতেন না, ফুর্তি করতেন। যাত্রা দেখতেন, গান শুনতেন, চায়ের কাপ হাতে ট্রাক স্ট্যান্ডে আড্ডা দিতেন।

তবে এখন শামসুল ড্রাইভার শুধুই ট্রাক চালান। সারাক্ষণ স্টার সিগারেট খান, আর পান থেকে চুন খসলে পল্টুকে গালি দেন।

পল্টু ঘুম ঘুম চোখে নিচে নামল। একই সময় শামসুল ড্রাইভারও ট্রাক থেকে নেমে আসলেন। পল্টুর মতো হাঁদারামের ওপর ভরসা করে বসে থাকার মানে নাই। এই ট্রিপের মাল ডেলিভারি করে নতুন পার্টির মাল লোড করতে হবে। ভোরের আগেই আবার তাঁকে গাইবান্ধা রওনা দিতে হবে।

ঠিক মাঝরাস্তায় একটা বেড়াল বসে আছে। বেড়ালটা সেখানেই স্থির হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে। দূরে একটা সাদা রঙের টয়োটা প্রিমিও গাড়ি আস্তে আস্তে চলে যাচ্ছে। একটু দূরে গিয়ে হঠাৎ গাড়িটা একটু থেমে গেলো।

গাড়ির পেছনের সিটের জানালা দিয়ে একজন মহিলা মাথা বের করলেন। মহিলা বেড়ালটার দিকে তাকিয়ে আছেন।

শামসুলদের দেখে উনি আবার মাথা গাড়ির ভেতর ঢুকিয়ে ফেললেন।

গাড়িটা আস্তে আস্তে অদৃশ্য হয়ে গেল।

পল্টু বিরক্ত মুখে বেড়ালটাকে হালকা একটা লাথি মারল। কিন্তু বেড়ালটা একচুলও নড়ল না। পল্টু এবার বেশ ভয় পেল।

— ওস্তাদ, হালার পো মনে কয় জীন।

— শুওরের বাচ্চা, চোপ।

— ওস্তাদ, চলেন গাড়ি ঘুরায় যাই গা। এই বিলাইয়ের ভাও আমার ভালো ঠেকতাসে না।

শামসুল সর্দার বেড়ালটার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বেড়ালটা এখনো দক্ষিণ দিকে তাকিয়ে আছে। ঠিক যেদিকে একটু আগে একটা সাদা প্রাইভেট কার চলে গেছে। অন্ধকারে বেড়ালের চেহারা ঠিকঠাক দেখা যাচ্ছে না। তবে দেখা যাচ্ছে, বেড়ালটার গলায় একটা নীল ফিনফিনে বেল্ট লাগানো। বেল্টে একটা লকেট। লকেটে মনে হয় কিছু লেখা।

শামসুল সর্দার হাঁটু গেড়ে বসে লকেটটা পড়ার চেষ্টা করলেন। ঠিক তখন বেড়ালটা প্রথমবার শামসুল ড্রাইভারের দিকে ধীরে ধীরে তাকাল।

বেড়ালটার চোখে ভয় নাই। রাগও নাই।

সেই দু চোখে শুধুই অবিশ্বাস।

শামসুল ড্রাইভার দেখলেন, লকেটে লেখা ‘মতি’।

পল্টু জিজ্ঞেস করল,

— ওস্তাদ, কী লেখা?

শামসুল সর্দার কোনো জবাব দিলেন না।

— ওস্তাদ, বিশ্বাস করেন, এইডা জীন। আমরা শিউর কট খাইসি। এরে ফালান। ফালায় গাড়ি ঘুরান।

শামসুল সর্দার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেড়ালটাকে কোলে তুলে নিলেন। বিড়ালটা কোনো বাধা দিল না। শুধু কাঁপছিল। ঠাণ্ডায় না, এটা একদম অন্য ধরনের কাঁপুনি।

শামসুল ড্রাইভার বেড়ালটাকে নিয়ে তাঁর ট্রাকে ফিরে এলেন। নিজের গামছাটা বের করে বেড়ালটার শরীর থেকে পানি মুছলেন। বেড়ালটা কোনো বাধা দিল না। সে একদৃষ্টিতে সামনের কাঁচ দিয়ে রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে।

ঠিক সেই দিকটায়।

যেদিকে গাড়িটা চলে গেছে।

শামসুল সর্দার গত আধা ঘণ্টা বেড়ালটাকে কোলে নিয়ে বসে আছেন। এই আধা ঘণ্টা বেড়ালটা সেই সামনের দিক থেকে একবারও চোখ সরায়নি।

মনে হচ্ছিল, বেড়ালটা অপেক্ষা করছে।

আধা ঘণ্টা পর ট্রাক নিয়ে শামসুল ড্রাইভার গাবতলী ট্রাক স্ট্যান্ডে পৌঁছালেন। তাঁর সাথে পল্টু। আর পল্টুর কোলে মতি।

পল্টু জীনের ভয় ঝেড়ে মতি বেড়ালকে কোলে নিয়ে বসে আছে। তাঁর মুখভর্তি হাসি। শামসুল সর্দার যখন বেড়ালটাকে তাঁর পাশে রেখে ট্রাক স্টার্ট দিয়েছিলেন, মতি বেড়াল তখন আস্তে করে পল্টুর কোলে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।

পল্টু এতিমখানায় বড় হয়েছে। এই জগৎ সংসারে তাঁর কেউ নেই। মতিকে কোলে নিয়ে পল্টু অবাক হয়ে ২ মিনিট বসে ছিল। এরপর সেই যে মতিকে সে জাপটে ধরেছে, এখন পর্যন্ত ছাড়েনি।

গাবতলী আবুল হোটেলে শামসুল আর পল্টু ভাত খাচ্ছে। গরম ভাত, লাউ-চিংড়ি আর মুরগির মাংসের পাতলা ঝোল। পল্টুর কোলে মতি। সে এখনো চুপ করে বসে আছে। গত ১০ মিনিটে ২০ বার পল্টু মতির মুখের সামনে খাবার ধরেছে। মতি সেদিকে একবার তাকায়ওনি।

সে রাতে শামসুল সর্দার গাইবান্ধা ট্রিপ ক্যান্সেল করেছিলেন। সকালবেলা তিনি মতিকে মোহাম্মদপুরে এক ভেটেরিনারি ক্লিনিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। কম বয়সী একজন মহিলা ডাক্তার। পল্টুর “বিলাইডা তো কিছু খাইতাসে না। অর কোনো অসুখ আছে কি না” প্রশ্নের জবাবে সেই মহিলা গম্ভীর মুখে জবাব দিয়েছিলেন, “abandonment trauma”।

ডাক্তার কী বলেছিল, শামসুল আর পল্টু কিছুই বোঝেনি। ওদের দোষ নেই, ওরা তো অশিক্ষিত। শিক্ষিত মানুষরাও যে খুব বোঝেন, এমনও তো আসলে না।

গত এক বছর ধরে মতি রাস্তায় থাকে।

সরি, রাস্তায় না; পথে থাকে। শামসুল সর্দার, পল্টু আর মতি বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত ট্রাকে চষে বেড়ান। শামসুল ড্রাইভার যখন ট্রাক চালান, মতি তখন পল্টুর কোলে লেপ্টে শুয়ে থাকে। সে মাঝে মধ্যেই ড্রাইভিং চলাকালীন শামসুল ড্রাইভারের কোলে উঠে যেতে চায়। শামসুল তাকে “শুওরের বাচ্চা, সর” বলে গালি দিয়ে সরিয়ে দেন।

মতি তাতে একটুও রাগ করে না। গাড়ির তালে তালে দুলতে দুলতে সে আনন্দে লেজ নাড়ায়।

তবে রাস্তায় কোনো সাদা কার গাড়ি দেখলে মতি খুব ভয় পায়। সে সাথে সাথে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

এই পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, যারা ভালোবাসতে ভালোবাসতে একদিন হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে যায়। তখন এক বৃষ্টির রাতে সেই ভালোবাসাকে গাড়িতে তুলে, নির্জন রাস্তায় নামিয়ে দিয়ে চলে যায়। তারপর বাড়ি ফিরে গরম ভাত খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে।

এই শহরের তাতে কিচ্ছু এসে যায় না।

ফার্মগেটের উপর দিয়ে মেট্রোরেল ছুটে যায়।

গুলশান দুই সার্কেলে গাড়ির ভোঁ ভোঁ হর্ণ বাজতে থাকে।

দূরে কোথাও ট্রাকে সঞ্জয় দত্ত’র “নায়াক নেহি, খলনায়াক হুঁ ম্যায়” গান বাজতে থাকে।

বৃদ্ধাশ্রমে আনারকলি বেগম তাঁর বিয়ের ছবির অ্যালবাম খুলে মৃত স্বামীর ছবিতে হাত বুলাতে থাকেন।

আর কোনো এক নির্জন রাস্তায়, কোনো একটা বেড়াল কিংবা কুকুর অপেক্ষা করে।

যে এখনো বিশ্বাস করে—

কেউ ফিরে আসবে।

15/05/2026

বোকাচোদা [শেষ পর্ব]

(প্রথম পর্বের লিংক প্রথম কমেন্টে দেয়া আছে। ঐ পর্ব না পড়লে এই লেখা পড়ার দরকার নাই।)

আমি কুয়েট থেকে চলে আসলাম। কিন্তু জারিফ আমাকে বিপদে ফেলা বন্ধ করল না। জারিফের সাথে লাইফে যে-ই মিশেছে, সে-ই বিপদে পড়েছে। আমি অন্তত ১০০টা ঘটনা বলতে পারব, যেখানে জারিফ মানুষকে শুধু তাঁর সাথে থাকার জন্য বিপদে ফেলেছে।

এবং সবচেয়ে সমস্যার ব্যাপার হচ্ছে, আপনি জারিফের ওপর ক্ষেপতে পারবেন, কিন্তু ওকে দোষ দিতে পারবেন না। কারণ বোকাচোদার নিয়ত একদম ঝরনার পানির মতো পরিষ্কার।

ঝরনার কথায় মনে পড়ে গেল: ১৬ সালে সিলেট গিয়েছি। সাথে রুম্মান আর ভোটকা অনিক। কই থেকে খবর পেয়ে এখানেও চলে এসেছে জারিফ জামান খন্দকার। সাথে নিয়ে এসেছে তাঁর রুমমেট আবু সালেহ রাহাতকে।

আমরা উঠেছি আমার বন্ধু হেভেন চাকমার বাসায়। বোকাচোদাটা সেখানেও হাজির। কোথাও আমার মুক্তি নাই।

বিকেলে জাফলংয়ের দিকে যাব। জারিফ দাবি করল, নতুন একটা ঝরনা আছে। আমাদের সেখানে অবশ্যই যাওয়া উচিত।

বর্ডারে এসে নৌকা থেকে নামলাম। গুগল ম্যাপ দেখে হেঁটে হেঁটে সেই ঝরনা খুঁজছি। এক পর্যায়ে আমাদের মাঝি বলল, “মামা, আর আগাইবেন না, সামনে ইন্ডিয়া।”

জারিফের ঝরনা তখনো দেখা যাচ্ছে না। সে দাবি করল, সামনে আগালেই দেখা যাবে। গুগল ম্যাপ নাকি সেটাই বলছে। আমাদের অবশ্যই যাওয়া উচিত। এই রিস্ক নেয় কেউ? আমি না করে দিলাম।

কে শোনে কার কথা? রুম্মান কে নিয়ে ততক্ষণে জারিফ এগিয়ে গেছে। এদিকে আমরা তিনজন কি করব ভাবছি। পেছন ফিরে দেখি, আমাদের মাঝি উল্টো দিকে দৌড় লাগিয়েছে।

এবার সামনে তাকিয়ে দেখি, দূরে রুম্মান আর জারিফ নীল ডাউন করে বসে আছে। তাদের দুজনের সামনে দুজন সৈনিক। সৈনিকদের হাতে রাইফেল। রাইফেলের নল এই দুই বোকাচোদার মাথায় তাক করা।

সৈনিক দুজন বিএসএফের। জারিফ এবং রুম্মান এখন ইন্ডিয়ায়। আমরা বাকি ৩ জন নো ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়ানো।

আমাদের দূর থেকে সৈনিকরা হাত দিয়ে ডাকছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলাম।

বিএসএফ জওয়ানরা আমাদের লাইন ধরে নীল ডাউন করিয়ে রেখেছে। আমি জারিফের দিকে তাকিয়ে আছি। এই বোকাচোদাকে নিছক ভালোবাসি বলে আমাকে আর কত কাফফারা দিতে হবে?

আমাদের ব্যাগ, মোবাইল সব জব্দ করা হল। মনে হয়, ধরে চালান করে দিবে। এরপর স্পাই বলে তিহার জেলে পাঠায় দিবে।

মারার হলে তো মেরেই ফেলত। আসার সময় শুনেছি, কালকে সকালেই নাকি এক গরুর ব্যাপারীকে শুট করে মেরে ফেলেছে বিএসএফ। এরা এই বর্ডারে পাখির মতো বাংলাদেশি মারে। এসব এদের কাছে কোন বিষয় না। বোকাচোদা জারিফের জন্য আমাকে এই বয়সেই মরতে হবে?

নীল ডাউন হয়ে এসব ভাবছিলাম। হুট করে একজন সৈনিক আমাকে জিজ্ঞেস করল,

– ইধার কিউ আয়া?
– We are Bangladeshi tourists, we didn’t know it’s India.
– হিন্দি মে বাত কর, বেহেনচোত।
– গালতি হো গায়া, ছোড় দো।

সৈনিক দুজন নিজেদের দিকে তাকিয়ে বলল,

– কারতে কেয়া হো?
– ইঞ্জিনিয়ারিং কারতা হু, স্টুডেন্ট হু।
– ইঞ্জিনিয়ার বানো গে, ইন্টারন্যাশনাল বর্ডার কে বারে মে পাতা নেহি হ্যায়?
– সরি।
– ইধার কিউ আয়া?
– এক ঝরনা ঢুঁন্ড রাহা হু।
– আচ্ছা, বাহুত খুব। কাহা হ্যায় ভো ঝরনা?

আমরা তখনো নীল ডাউন করে বসে আছি। আমাদের সামনে বন্দুক তাক করে দুইজন সৈনিক প্রশ্ন করছে। এই সময় জারিফ জামান খন্দকার খুব সিরিয়াস কণ্ঠে বলল,

– আগার আপ মেরে মোবাইল দো গে, তো ম্যায় আপকো দেখাউঙ্গা, ইধার এক ঝরনা হ্যায়। ম্যায় শিওর হু।

আমি নীল ডাউন করে না থাকলে এই বোকাচোদাকে উড়ে এসে একটা লাথি মারতাম। তবে সেটাও মনে হয় মিস করতাম; আমার পা এই দেড় ফুটিয়া বোকাচোদার মাথার ওপর দিয়ে চলে যেত।

সৈনিকদের একজন জারিফের দিকে তাকালেন। এরপর তাঁর কলিগের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইস গাঞ্জে কি ব্যাগ চেক কার।”

জারিফের ব্যাগ চেক করা হল এবং সেখান থেকে ২৫ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেল।

হাতে ২৫ গ্রাম সিলেটি সস্তা গাঁজার পোটলা নিয়ে বিএসএফ জওয়ান জারিফের দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল,

– কেয়া হ্যায় ইয়ে?
– টোব্যাকো হ্যায়।
– আচ্ছা, ইয়ে টোব্যাকো হ্যায়?
– হা।
– ইসে কেয়া কারতে হ্যায়?

জারিফ গম্ভীর গলায় বলল, “সিগারেট মে ভারকে স্মোক করতে হ্যায়।”

আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আর কোনো আশা নাই।

জারিফ আমাকে কানে কানে বলল, “ভাই, এটা গাঁজার পোটলা। কিন্তু ভিতরে হ্যাশ নাই, সিগারেটের সুগার। টেনশনের কিছু নাই। আমি রেখে দিসিলাম। এদিকে তো দোকান নাই, পরে তোমরা রিজলা বানাইতে চাইলে সুগার পাবা না তাই।”

একটা ছেলে গাজার পোটলায় সিগারেটের টোবাকো ভরে ব্যাগে রেখে ঘুরছে। এরপর সেটা নিয়ে বর্ডার ক্রস করে বিএসএফ এর কাছে কট খেয়েছে।

আমার ইচ্ছে হল বিএসএফ জওয়ানকে ডেকে বলি, “এই বোকাচোদারে প্লিজ আপনি শুট করেন। আর আপনি না করতে চাইলে আমাকে দেখান কীভাবে গুলি করতে হয়। আমি এই চুদির ছেলেকে ৩৬টা গুলি করতে চাই।”

ওরা মনে হয় বুঝতে পারল, এটা সুগার। একজন জওয়ান বলল, “হামারে সাথ আও।”

আমরা উঠে দাঁড়িয়ে ওদের পিছে পিছে হাঁটতে লাগলাম। এখন কই নিয়ে যাবে? বাসায় একটা খবর তো দেওয়া দরকার ছিল। কী করব?

যেতে যেতে একটা খালের পাশে আমাদের থামতে বলা হল। জারিফ আমাকে বলল, “ভাই, ৭১-এ খালের পাশে নিয়ে শুট করে দিত। এখন মনে হয় শুট করে দিবে।”

কেউ এই বোকাচোদাকে ছেড়ে দেন প্লিজ। ও বাসায় চলে যাক। আমি ওর সাথে দেশে ফিরব না। আমি নিজ দায়িত্বে ইন্ডিয়ান হাজতে ঢুকে যাচ্ছি। তবুও এই বোকাচোদার বাটখারার সাথে আর এক মিনিট আমি থাকতে রাজি না।

জওয়ান দুজন আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,

“ইয়েহ হ্যায় ভো ঝরনা, জিতনা মারজি দেখো, পানি পিও, উসকে বাদ ঘর যাও। বেটা, কাভি বর্ডার ক্রস মাত কারনা, হামে পতা হ্যায়, তুমলোগ ট্যুরিস্ট হো। জঙ্গল সে হাম পনেরা মিনিট তাক তুম লোগো কো দেখা ইধার আতে হুয়ে। যাও, এঞ্জয় কারো।”

আমরা যতক্ষণে নো ম্যানস ল্যান্ড ক্রস করে দেশে ঢুকেছিলাম, ততক্ষণে সিলেটের ডিসি অফিস পর্যন্ত খবর চলে গিয়েছিল। জাফলংয়ের রাস্তার সব সিএনজি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের যে সিএনজি ড্রাইভার নিয়ে এসেছিল, তাকে বাজারে বেঁধে রাখা হয়েছিল।

বিডিআর আমাদের ১ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। মনে আছে, বিএসএফের সৌজন্যে ফ্রিতে ইন্ডিয়া ঘুরে এসে বিডিআরকে নাস্তা খরচ বাবদ ১০০০ টাকা দিতে হয়েছিল।

এই সব হয়েছিল শুধুই জারিফ জামানের জন্য। ফেরার পথে আমি প্রচণ্ড রেগে ছিলাম। জারিফকে বললাম, “এই ঘটনা যেন কেউ না জানে।”

আমি সিলেট শহরে ফেরার আগে জারিফ জামান এই ঘটনা পুরো কুয়েটমহলে ছড়িয়ে দিয়েছিল। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, সবাই কীভাবে জানল, সে গম্ভীর মুখে বলেছিল,

“ভাই, বিষয় হচ্ছে হইল, তুমি বলার আগেই আমি দুই-একজনকে বলে ফেলসিলাম। তুমি মানা করার পর আমি কাউকে কিছু বলি নাই। ভাই তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।”

২০১৯ সালে আমি বেইলি রোডের দিকে শিফট করলাম। জারিফ এখন আমার একমাত্র প্রতিবেশী। রোজ দুই বেলা করে জারিফের সাথে চা-বিড়ি খাই। সে রোজ নতুন নতুন বিপদে পড়ে, সেসবের সমাধান দেই। সব ই আসলে টাইম পাস।

রোজ নতুন নতুন ছেলেদের সাথে আমার পরিচয় হয়। এরা সবাই জারিফের কুয়েটের জুনিয়র। আমার চেয়ে অনেক ছোট, আমি এঁদের কাউকে চিনি না।

এঁদের একজন রোজ আমাদের সাথে আড্ডা দিতে আসে। একদিন সেও আমাকে তুমি করে বলা শুরু করল। রাতে দেখি সেই ছেলে আমাকে ফোন দিয়েছে।

– ভাই, আমি আপনাকে তুমি করে ডাকসিলাম। আমি খুবই সরি। আমার ঠিক হয় নাই।
– আরে, কী হইসে তাতে? আবার ফোন দিয়ে সরি বলার কী আছে এখানে?
– আপনি যাওয়ার পর জারিফ ভাই আমাকে ২ ঘণ্টা র‍্যাগ দিসে, ভাই। পাশ করে বের হবার পর র‍্যাগ খেয়ে গেলাম, ভাই।
– বলো কী!
– জি ভাই, আমাকে মাফ করবেন প্লিজ।

এর মধ্যে বোকাচোদা জারিফ জানালো, সে বিসিএসের প্রিপারেশন নিচ্ছে। সে বাপ-মা ছেড়ে আমেরিকা যাবে না। এটা তাঁর মোরাল গ্রাউন্ডের সাথে যায় না।

কিছুদিন পর বোকাচোদাটা বিসিএস প্রিলিতে ফেল করল। এদিকে কুয়েটের গরু-গাধাদেরও বিসিএস হয়ে যাচ্ছে। আমি জারিফের উপর খুবই বিরক্ত হলাম।

যে জারিফকে আমি চিনতাম, এই ছেলে সে না। জারিফের পড়াশোনায় কোনো মন নাই। সারাদিন জুনিয়রদের সময় দেয়। জুনিয়ররা ঢাকায় এসে জারিফের বাসাতেই থাকে। এরা জারিফের বাসায় বসে পড়াশোনা করে, জারিফ নিজে তখন বাসায় থাকে না। সে তাঁর স্কুলের বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘোরে। আমার সাথে দেখা হলে আমি ঝাড়ি দেই, তাই আমার সাথে বেশিক্ষণ থাকে না।

বোকাচোদার নিজের কোনো চাকরি নাই, কিন্তু সে এর-ওর জন্য তদবির করে বেড়ায়। আমার এক বন্ধুর পোস্টিং সে আংকেলকে বলে ঢাকায় করে দিল। জারিফের এক স্কুল ফ্রেন্ড PWD-তে জয়েন করেছে। তাঁর পোস্টিং ঢাকায় কীভাবে করা যায়, সেই ব্যাপারে সে আমার সাথে দেখা করতে এসেছে। তাঁর দাবি, আমাকে আমার বাপের কাছে ঐ ছেলের পোস্টিংয়ের জন্য তদবির করতে হবে। জারিফের এসবে আমি ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি জানি, বিরক্ত হয়ে কোনো লাভ নাই।

একদিন জারিফ এসে জানালো, ঢাকায় তাঁর পড়াশোনা হচ্ছে না, সে কুয়েট চলে যাবে। এবং আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সে কুয়েট চলে গেল। সেখানে সে লেখাপড়ার নামে জুনিয়রদের সমস্যা সমাধান করা শুরু করল। আজকে এই গ্রুপের অমুক আরেক গ্রুপের তমুককে থ্রেট দিয়েছে। মিউচুয়াল কে করবে? জারিফ জামান।

কালকে হল কমিটি নিয়ে গ্যাঞ্জাম। মিউচুয়াল কে করবে? জারিফ জামান। খবর পেয়ে আমি এবার ক্ষেপে গেলাম। বোকাচোদাটাকে ফোন দিলাম।

– কী শুরু করসস তুই?
– কেন ভাই? কী হইসে?
– তুই তো ৪ বছর ছাত্রলীগ করসস। ১টা পয়সাও তো পকেটে ঢুকাস নাই, উল্টা লোকজনরে হেল্প করতে গিয়া বিপদে পড়সস। এখনো শিক্ষা হয় নাই? এখনো তোর ক্যাম্পাসের পলিটিক্সে নাক গলানোর দরকার আছে?
– ভাই, এরা আমার জুনিয়র। এঁদের আমি রাজনীতিতে নিয়া আসছি। এঁদের সমস্যায় আমি থাকব না?
– এই বোকাচোদা, তুই না খুলনা গেসস পড়াশোনা করতে?
– ভাই, করতেসি তো। তুমি টেনশন কইরো না। আমার একটা কিছু হয়ে যাবে।

২ মাস পর জারিফ ঢাকা ফেরত আসলো। কিন্তু খুলনা শহর ছেলেটার পিছু ছাড়ল না। কারণ ঠিক ২ মাস পর জারিফ কৃষি ব্যাংকে জয়েন আবার খুলনা চলে গেল। তাঁর পোস্টিং খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চল বটিয়াঘাটায়।

সে শহরে বাসা নিয়েছে। রোজ সে সিএনজিতে করে বটিয়াঘাটা আসা-যাওয়া করে।

এই সময় আমি ১৫ দিনের জন্য খুলনা গেলাম। কোনো কাজে না, এদিক-ওদিক ঘুরব, ছবি তুলব— এই টুকুই। আমি উঠলাম চাচার বাসায়, দৌলতপুরে। প্রতি সন্ধ্যায় আমি খুলনা শহরে যাই। জারিফের সাথে দেখা হয়। একদিন সে জোর করে আমাকে তাঁর বাসায় রেখে দিল।

সেদিন খুলনায় চমৎকার বৃষ্টি নেমেছে। জারিফের জুনিয়র ফরহাদ বাসা থেকে গরুর মাংস রান্না করে নিয়ে এসেছে। ভাত-গরুর মাংস খাওয়া হবে।

আমি জারিফের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি। দেখি, জারিফ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাসার দিকে আসছে। এই ছেলে এই বৃষ্টিতে বাইরে গেছে কেন?

বোকাচোদাটা ভিজে জুবুথুবু হয়ে ঘরে ঢুকেছে। হাতে একটা পাউরুটির প্যাকেট। ‘জোবায়ের পাউরুটি’।

বহু বছর আগে কুষ্টিয়ায় লালন সাঁইয়ের মাজারে বসে আমি জারিফকে বলেছিলাম, আমার প্রিয় খাবার পাউরুটি-গরুর মাংস।

ঢাকায় ফিরে ১ মাস পর জানতে পারলাম, জারিফ জামান খুলনায় তরমুজের ব্যবসা করছে। আগের বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই সে এবার তরমুজে ইনভেস্ট করেছে। স্বাভাবিকভাবেই সে একা করে নাই, সাথে ৪-৫ জন ভাই-ব্রাদার নিয়ে করেছে। এবং যথারীতি হোগামারা খেয়েছে।

তরমুজ ব্যবসায় ৫ লাখ টাকা লস খেয়ে জারিফ বনানী ব্রাঞ্চে পোস্টিং নিয়ে ঢাকায় ফেরত আসলো।

কেটে গেল আরও কিছুদিন। সামনে আমার বিয়ে। জারিফ আর মুন্না হাজির। তারা আমার বিয়ে নামানোর দায়িত্ব নিয়ে নিল।

আমি দাওয়াত দেয়া শুরু করলাম। আমার নিজের গেস্টের চেয়ে বোকাচোদা জারিফের গেস্ট বেশি। আমি বিরস মুখে এঁদের দাওয়াত দিতে থাকলাম।

লজিস্টিকস জারিফ আর মুন্না দেখবে। বিয়ের দিন জারিফ, মুন্নার অফিস থেকে একটা SUV নিয়ে এসেছে। সেই কোটি টাকার গাড়িতে চড়ে আমার বাপ-মা, খালা বিয়েতে গেলেন।

বৌভাত আমাদের অনুষ্ঠান। আমাদের মানে জারিফ আর মুন্নার অনুষ্ঠান। ভেন্যু অফিসার্স ক্লাব। ভেন্যুতে একটা পুলিশের গাড়ি উপস্থিত। কারণ বিয়ের গিফট আনার জন্য একটা পিকআপ ভ্যান থাকলে ভালো হয়। আমি ভেন্যুতে পৌঁছে দেখি পুলিশ ভ্যান। আমি এদিকে এসবের কিছুই জানি না।

জারিফ আর মুন্না এসব রেডি করে স্যুট পরে খাবার গুনতে ঢুকে গেছে। কয়টা খাবার যাচ্ছে, বাইরের কেউ খাচ্ছে কি না— ৪ ঘণ্টা ধরে হেঁটে হেঁটে দুজন এসব তদারকি করছে।

আমার সাথে কে কে খাবে, তাঁর লিস্ট সকালেই আমার থেকে জারিফ এসে নিয়ে গেছে। এঁদের সবাইকে সে ৩০ মিনিট পরপর মনে করিয়ে দিচ্ছে যেন খিদা লাগলেও তারা কেউ না খেয়ে ফেলে। “ভাই আপনাদের নিয়ে একসাথে খাবে।”

আমি আমার মামা-শ্বশুরের সাথে ছবি তুলছি। দেখি, দূর থেকে জারিফ জামান দৌড়ে আসছে। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম। আবার জানি কী হলো।

জারিফের চেহারায় প্রচণ্ড রাগ। সে মোবাইল বের করে একজনের ছবি দেখিয়ে বলল, “ভাই, একে চিনো? এ ২ বার খাবার খাইসে। এরে কি তাইলে সাইডে নিয়া বানাবো আমরা, ভাই?” আমি হতাশ হয়ে ওর দিকে তাকালাম। সে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে আমার ডিসিশনের জন্য অপেক্ষা করছে।

বিয়ের পর আমি বাসা চেঞ্জ করে মিরপুর চলে আসলাম। জারিফের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ কমে গেল। ছেলেটা কী করে, কিছুই জানি না। সোশ্যাল মিডিয়া পার্সন জারিফ কখনোই ছিল না। ২-৩ সপ্তাহ পরপর হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়।

বোকাচোদা এরই মধ্যে দুই-তিনবার বিসিএস ভাইভা দিয়েছে। ভাইভা দিয়ে একদিন আমার সাথে দেখা করতে এসেছে। পায়ে দেখি নতুন এক জোড়া সুন্দর বুট জুতা। জানলাম, জুতাটা মুন্না জারিফের জন্য বাইরে থেকে নিয়ে এসেছে। বোকাচোদাটা ফরমাল পরে সাথে সেই বুট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

ভাইভার বিস্তারিত শুনলাম। সে আমার কাছে জানতে চায়, তাঁর ভাইভা কেমন হয়েছে বলে আমার মনে হয়।

আমি বললাম,
– ভাইভা আবার খারাপ হবে কেন?
– ভাই, আমার ভাইভা ভালো হওয়া টাফ।
– ধ্যাত, কী কস? তুই অনেক নলেজেবল। তোর অ্যাটিটিউড পছন্দ হবে এক্সামিনারদের। স্বাভাবিক।
– না ভাই, স্বাভাবিক না।
– কেন?

জারিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,

– ভাই, আমার হাইট ৫ ফুট ২ ইঞ্চি। জুতা পরলে ৩ ইঞ্চি। আমার মাথায় চুল নাই। আমার চেহারাটাও ভালো না। তুমি এত লম্বা একটা মানুষ। তুমি যখন কোনো রুমে ঢোকো, সবাই ইমপ্রেসড হয়। তোমার ব্যাপারে একটা ভালো এক্সপ্রেশন থাকে। আমাকে কেউ খেয়াল করে না। আমার ব্যাপারে কোনো এক্সপ্রেশন তৈরি হয় না। আমারে সেটা তৈরি করতে হয়। তৈরি করতে সময় লাগে। বেশিরভাগ সময় আমি সেই সময়টা পাই নাই লাইফে।

আমি কেন জানি কিছু বলতে পারলাম না।

কিছুদিন পর মুন্নার বিয়ে। বিয়েতে আমি আর আমার স্ত্রী বিভা যাব। জারিফ তাঁর বন্ধু সুদীপ্তকে নিয়ে আমার বাসায় হাজির। সাথে সুদীপ্তর গাড়ি। জারিফের দাবি, “ভাবী যাবে আমাদের বিয়েতে, গাড়ি নিয়ে না আসলে কীভাবে হয়?”

বিয়েতে গিয়ে দেখি, মুন্নার গার্ডিয়ান জারিফের বাবা খন্দকার সাহেব। এদিকে জারিফ ব্যস্ত বিভার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, সেটা নিয়ে।

বিভা আমার সাথে একটা ছবি তুলতে চাইল। বোকাচোদা জারিফ, মুন্না আর ওর বউয়ের ছবি তোলানো বন্ধ করে ফটোগ্রাফার নিয়ে চলে আসলো আমাদের ছবি তোলার জন্য। আমি আরও একবার বিরক্ত এবং হতাশ হলাম।

আওয়ামী লীগের পতনের দিন আমি ছবি তুলতে বের হয়েছি। জারিফের সাথে দেখা করলাম। ছেলেটা মানতে পারছে না, শেখ হাসিনা সবাইকে এভাবে বিপদে ফেলে একা পালিয়ে গেছেন।

রাস্তায় সবাই যখন শেখ মুজিবের ছবি পোড়াচ্ছিল, জারিফ রেগে যাচ্ছিল। একসময় সে হতাশ হয়ে বলে ফেলল, “ভাই, ভালো হইসে পালায় গেসে। মহিলা মানুষ। না পালাইলে লোকজন কী করত ঠিক নাই। এগুলা দেখলে ভুলতে পারতাম না। এমনিতেই নেতা-কর্মীদের লাইফ নষ্ট কইরা গেসে। নিজের লাইফ অন্তত ঠিক রাখুক।”

কিছুদিন পর শুনলাম, জারিফের বাপ তাঁর ছেলেকে বিয়ে দিতে চান। খন্দকার সাহেবের ধারণা, জারিফের এখনো বিয়ে হয় নি শুধুমাত্র একটি কারণে। কারণ জারিফ টাক।

উনি তার টাক ছেলে কে এখন টাকা দিতে চান। জারিফকে সেই টাকা নিয়ে হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে টাক সমস্যার সমাধান করতে হবে। শুরু হলো নতুন এক পিনিক।

টাক নিয়ে গ্যাঞ্জাম করে জারিফ বাসা থেকে বের হয়ে যায় প্রায়। উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের মধ্যে সে আংকেলকে ডায়লগ দিয়ে দিল, “যে মেয়ের আমার চুল নিয়ে সমস্যা, তাঁকে আমার দরকার নাই।”

জারিফের ফুপু থেকে ভাবিরা জারিফকে ফোন দেয়া শুরু করল। সবাই জারিফকে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারের খোঁজ দেন। আংকেল এদের কল দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন তার বোকাচোদা টাক ছেলেকে চুল গজানোর ট্রিটমেন্ট করাতে রাজি করানোর।

বিয়ে নিয়ে নানা পিনিকের শেষ লগ্নে অবশ্য জারিফের বিয়ে হয়ে গেল। এই তো মাত্র ৮ মাস আগের কথা। আমি অত্যন্ত বিরক্ত হলাম। যাক বোকাচোদা এবার কম বিরক্ত করবে।

জারিফের বিয়েতে গেলাম। আমার স্ত্রী তখন ৩১ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট। তাকে ছাড়াই যেতে হল। এই প্রথম জারিফকে দেখলাম আমার ওপর রাগ করতে। তার ভাবী কে কেন নিয়ে যাই নাই?

বোকাচোদাকে আমি কোনভাবেই বোঝাতে পারলাম না যে একজন প্রেগন্যান্ট মেয়ের পক্ষে এই সময় চলাফেরা করা মুশকিল। আমি একটা পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিলাম।

জারিফের বিয়ের ২ মাস পর আমার একটা ছেলে হলো। বিভা আর আমি কয়েকবার আলাপ করলাম, জারিফ আর ওর বউকে বাসায় দাওয়াত দিতে হবে। একটা জামদানি শাড়ি কিনতে হবে ওর বউয়ের জন্য। কিন্তু এই অবস্থায় তো দাওয়াত দেয়া যায় না। বাচ্চা অনেক ছোট। কোরবানির ঈদের পর একদিন ওদের বাসায় ডাকতে হবে।

এর মধ্যে গত বছর আমি একটা গাড়ি কিনেছি। জারিফকে ইচ্ছা করে জানাই নি। খুলনা থাকতে জারিফ আর আমার প্ল্যান ছিল, একদিন একটা গাড়ি নিয়ে পুরো খুলনা ঘুরব।

আমার প্ল্যান হচ্ছে, একটা বন্ধ দেখে ওকে বলব, “চল খুলনা যাই।” এরপর বাস টার্মিনালে গাড়ি নিয়ে এসে ওকে গাড়িতে তুলে খুলনা চলে যাব।

গত মাসে একদিন জারিফ আমার সাথে দেখা করতে গুলশান আসলো। দুপুরে একসাথে লাঞ্চ করলাম। এই বোকাচোদার মাথায় এখন নতুন ভূত ভর করেছে। সে ব্যবসা করবে। তরমুজের লস খেয়েও এই ছেলের শিক্ষা হয় নাই। আমি আবার বিরক্ত হলাম।

যাওয়ার আগে বলল,
– ভাই, ভাতিজাকে তো দেখলাম না। একদিন আমাদের সময় দাও না। বউরে নিয়া আসি।
– তোর ভাবী একটু সুস্থ হোক। আয়োজনের ব্যাপার আছে একটা।
– কী ভাই আয়োজন। সুলতানস থেকে কাচ্চি অর্ডার করে দিলেই তো হয়।
– বোকাচোদা, তুমি একা আসলে বরবটি ভাজি দিয়েও খাওয়ানো যায়। তোমার বউকে এভাবে ডাকা যায় না। তোমার বউকে দাওয়াত দিয়ে কাচ্চি অর্ডার করে খাওয়ালে, তোমার ভাবী আমাকে বাসা থেকে বের করে দিবে।
– আচ্ছা ভাই, যা ভালো বুঝো। তাড়াতাড়ি ডাকো। ভাতিজার সাথে ভাও করা দরকার। আমাদের লাইনে আনতে হবে ওরে।

আর বেশিক্ষণ থাকলে বিরক্ত করা শুরু করবে। আমি ডিসিসি মার্কেট থেকে ওকে একটা ভেপ কিনে দিয়ে বাসায় পাঠায় দিলাম।

গত সপ্তাহের বুধবার সে আবার দেখা করতে চাইল। নিশ্চয়ই বোকাচোদা আবার ব্যবসা নিয়ে আলাপ করবে। কপাল ভালো, ঐদিন আমি ছুটিতে ছিলাম। বেচারা মন খারাপ করে ফোন রেখে দিল। দেখা হলো না।

২ দিন পর শুক্রবার দুপুর ২টায় জারিফ মারা গেল।

এই বোকাচোদা এক দিনে ৩টা হার্ট অ্যাটাক করে মরে গেল!

আপনি চিন্তা করতে পারেন, একটা ছেলে কতটা বোকাচোদা হলে একদিনে তিনবার হার্ট অ্যাটাক করে?

বোকাচোদাটা আমার ছেলেটাকে না দেখেই চলে গেল। আমার গাড়ি কেনার খবরটাও পাইল না। আমাকে কী এক মহা বিপদে ফেলে চলে গেল, চিন্তা করে দেখেন! আমি এখন আমার ছেলেকে বোঝাবো কীভাবে যে, মানুষের মন কত বড় হয়?

গেলাম বোকাচোদাটাকে দেখতে। একটা লাশের গাড়ি। সেটার ভেতরে বোকাচোদাটা শুয়ে আছে। গাড়ির আবার দেখি সুন্দর সিস্টেম। ভেতরে ঢোকা লাগে না। গ্লাসের একটা জানালা আছে। সেখান দিয়েই দেখা যায়।

সেই জানালা দিয়েই দেখলাম, আমার প্রচণ্ড আদরের ছোট ভাইটা ঘুমিয়ে আছে।

এই বোকাচোদা, কে বলেছে তোর চেহারা ভালো না? কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে!

দেখে মনে হচ্ছে, বোকাচোদাটা গোসল করে মুখে ক্রিম মেখে ঘুমিয়ে আছে। একটু পর উঠে বলবে,

“ভাই, আমার ২০ টাকা।”

15/05/2026

বোকাচোদা [প্রথম পর্ব]

পুকুরে এক ডুব দিয়ে মাথা তুলে দেখি একটা দেড় ফুট লম্বা টাক লোক পুকুরঘাটে দাঁড়িয়ে আছে। এই শ্রেণির লোকজন ক্যাম্পাসের পাশে খানাবাড়ি এলাকায় থাকে। দুপুরবেলা গামছা কাঁধে খাজা হলের পুকুরে আসে গোসল করতে। এরা চলে গেলে আবার এদের বৌ’রা আসে কাপড় ধুতে। কাপড় ধোয়া শেষে সেসব মহিলারা পুকুরেই গোসল করে। একদম 'এক সাবানে কাপড় কাঁচা, সেই সাবানে গোসল'।

আমার কিছু বন্ধু আবার ঠিক ওই সময়ই পুকুরে গোসল করতে যায়। আমি অবশ্য আমার বন্ধুদের খুব একটা দোষ দেখি না। খুলনা একটা মরুভূমি। কোথাও কোনো এন্টারটেইনমেন্ট নাই। চিত্ত বিনোদনের প্রয়োজন সবার আছে। আমি আবার একটা ডুব দিলাম।

আমি সাতার পারি না। প্রতি বছর এই পুকুরে গোসল করতে এসে কুয়েটের ১ জন করে স্টুডেন্ট মারা যায়। এরা সবাই সাতার পারত। আমার এনালাইসিস অনুযায়ী, যারা সাতার পারে না, তারা পানিতে ডুবে মরে না। এরা জানে, এঁদের দৌড় পুকুরঘাট পর্যন্ত। এরা সেইফ। আমিও সেইফ।

খাজা হলের পুকুর মাঝখানে অনেক গভীর। পুকুরঘাটের শেষের আগের সিঁড়িতে বসেই আমাকে ডুব দিতে হয়। আমার হাইট ৬ ফিট ৩ ইঞ্চি। দাঁড়িয়ে ডুব দিলে ওই সিঁড়িতেও আমার কোমর পানি হয়। তাই আমি বসে ডুব দেই। কোনো রিস্ক নেওয়া যাবে না, এই ইয়ং বয়সে মরার কোনো শখ আমার নাই।

সময়টা ২০১৩ সাল। 2-2-এর টার্ম ফাইনাল চলে। পরদিন মনে হয় আমার সলিড মেকানিক্স সেকেন্ড পার্ট পরীক্ষা ছিল। দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে আমি রশিদ হলের সামনে বসে চা-বিড়ি খাচ্ছি। আমার রুমমেট রুম্মানকে দেখলাম হাফ প্যান্ট আর হাতে গামছা নিয়ে খান জাহান আলী হলের দিকে যাচ্ছে। পথে আমাকে দেখে ধরে নিয়ে এসেছে।

লুঙ্গি পরে পুকুরে ডুব দিয়েছি। পুকুরঘাটে আমার গামছা রাখা। লুঙ্গি আমার বন্ধু ময়নের। রশিদ হলে ওর রুমের সামনে দড়িতে লুংগিটা ঝুলছিল। নিয়ে চলে এসেছি। ময়ন কই জানি না। গামছাটা ফজলুল হক হলের রিফাত কাকার।

শরীরটা অবশ্য আমার নিজের। সেই শরীর নিয়েই কোমর পানিতে দাঁড়িয়ে আছি। ঠিক তখনই আমার সামনে সেই দেড় ফুটিয়া টাক ভদ্রলোক পানির তলা থেকে উদয় হলেন। আমি প্রচণ্ড ভয়ে পিছলে পড়ে গেলাম।

টাক ভদ্রলোক উঠে এদিক-ওদিক তাকালেন। এরপর আমাকে বললেন,

– “আসসালামুয়ালাইকুম ভাই। আমি জারিফ জামান খন্দকার। সিভিল টু কে টুয়েলভ। ড. এম এ রশিদ হল। আমি আপনার স্কুলের জুনিয়র ভাই। আপনার সাথে পরিচিত হতে আসলাম।”

আর এভাবেই গলা পানিতে শুয়ে থাকা অবস্থায় আমার সাথে জারিফের পরিচয়।

এই ধরনের পরিচয়পর্বের সাধারণত সিক্যুয়েল থাকে। সিক্যুয়েলে রাতে ডাইনিংয়ের পর হলের রুমে আবার পরিচয় হবার জন্য ডাক পড়ে। সেই পরিচয়পর্ব মানে কঠিন র‍্যাগ।

কিন্তু কালকে পরীক্ষা। পার্ট ওয়ানে আমি ফেইল করেছি। রিস্ক নেওয়া যাবে না। আমি খুব বিরক্ত হয়ে বললাম,

– আমি যে আইডিয়ালের, তোমাকে কে বলসে?
– জি ভাই, রুম্মান ভাই বলসে।
– হুম। ঢাকায় বাসা কই?
– বেইলি রোড ভাই। ভাই যদি কিছু মনে না করেন, আমি একটু উপরে উঠে শ্যাম্পু নিয়ে আসব?

আমি এবার ফ্যাক করে হেসে ফেললাম। ছেলের সেন্স অব হিউমার তো বেশ ভালো। আমি হাসতে হাসতে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সে সিরিয়াস চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এর মানে, এই টাক বোকাচোদা আসলেও এখন শ্যাম্পু করবে। এই দৃশ্য মিস করা যায় না। আমি আগ্রহ নিয়ে বললাম, “যাও নিয়ে আসো।”

ছেলেটা পুকুরঘাট থেকে একটা শ্যাম্পুর বোতল নিয়ে আসল। সে এক হাত ভরে শ্যাম্পু নিয়ে নিজের টাকে মাখতে লাগল। এই শ্যাম্পু আমি আগে দেখি নাই।

– এটা কোন শ্যাম্পু?
– ভাই, এটা আমি ইস্তানবুল থেকে আনাইসি ভাই। এটা হেয়ার ফল কমানোর জন্য খুব ভালো একটা শ্যাম্পু ভাই।

আমি আর নিতে পারলাম না। পুকুর থেকে উঠে ঘাটে বসে একটা বিড়ি ধরিয়ে হো হো করে হেসে ফেললাম। পাশে তাকিয়ে দেখি, রুম্মানও ভ্যাক ভ্যাক করে হাসছে।

আর ঠিক এভাবেই আমার জীবনে এসেছিল জারিফ জামান খন্দকার। আমার লাইফে দেখা সবচেয়ে বড় বোকাচোদা। যে ছেলেটা এক জীবনে আমাকে সবচেয়ে বেশি বিপদে ফেলেছে।

আমি থাকতাম লালন শাহ হলের ৩১৫ নম্বর রুমে। রুমে আমি-সহ ৩ জন ছিলাম আইডিয়াল স্কুলের। জারিফের তাই প্রায়ই আসা-যাওয়া ছিল। বোকাচোদাকে দেখলেই আমি বিরক্ত হতাম। আস্তে আস্তে টের পেলাম, বাকিরাও ওর ওপর খুব বিরক্ত।

পকেট গেটের কোনো টং দোকানে দেখা হলেই জারিফ খুব গম্ভীর মুখে বলে, “ভাই আমার বিশ টাকা।” তখন বেনসন ১৫ টাকা ছিল। এই ছেলে একটা বেনসন আর এক কাপ চা খায়। এরপর সিনিয়রদের দেখে বিল ধরিয়ে দেয়।

আমার রুমমেট আবারার বা তৌসিফ কেউ সিগারেট খায় না। তাঁদেরও জারিফ ২০ টাকার নজরানা দিয়ে চলে যায়। এই বোকাচোদার ওপর বিরক্তি সবার চরম সীমায় পৌঁছাল। আমাদের রুমে এই বোকাচোদার নাম হয়ে গেল ‘বিশ টাকা’।

এমন অবস্থায় আমি ‘বিশ টাকা’র সাথে সুন্দরবন চলে গেলাম। কুয়েটের সব ডিপার্টমেন্টের থার্ড ইয়ার, ফার্স্ট ইয়ারের বাচ্চাদের নিয়ে একটা সুন্দরবন ট্যুর দেয়। ৩ দিনের ট্যুর। একটা বড় লঞ্চ ভাড়া করে ২ ব্যাচ সুন্দরবন যায়। আমিও গেলাম।

লঞ্চে উঠেই দেখি বোকাচোদা জারিফ জামান তাঁর ক্লাসমেটদের হাত-পা নেড়ে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছে— “বিষয় হচ্ছে হইল, মেয়েরা কেবিন পাবে, আমরা ডেকে থাকব। বড় ভাইদের ডিস্টার্ব করা যাবে না। ভাইরা যারা বিড়ি খায় না, তাঁদের আশেপাশে বিড়ি খাইস না প্লিজ। আর সমস্যা হলে আগে আমারে বলবি, ভাইদের ডিস্টার্ব করবি না একদম।”

বোকাচোদার গায়ে কালো চাদর। ফুল প্যাকেজ সাজিয়ে বিরাট লিডার সেজেছে সে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখি, লঞ্চের মধ্যেই একটা টং দোকান। একটা নি:শ্বাস ফেলে আমি মানিব্যাগ খুলে ২০ টাকার নোট গোনা শুরু করলাম।

সেই সুন্দরবন ট্যুরের কোনো স্মৃতি আমার নাই। আমার বন্ধু মাখন আমাকে ওই ট্যুরের কোনো স্মৃতি নিয়ে ফিরতে দেয় নাই। সে ৩ দিন ২৪ ঘণ্টা আমার সাথে লঞ্চের ছাদে বসে বাঁশি বাজিয়েছে।

তবে একটা স্মৃতি মনে আছে। শেষদিন লঞ্চের ডেকে একটা কালচারাল প্রোগ্রাম ছিল। আমি সিঁড়ি দিয়ে ডেক থেকে নিচে নেমে যাচ্ছি। আমার অবস্থা ভালো না। হুট করে কই থেকে জারিফ জামান চলে আসল। বোকাচোদা বলে,

“ভাই, আপনার শরীর খারাপ মনে হচ্ছে। আমাদের মেয়েরা তো এখন ডেকে চলে আসছে। আপনি ওদের কারও কেবিনে গিয়ে রেস্ট করেন। আসেন আমার সাথে।”

ভাবতে পারেন, কত বড় বোকাচোদা? এই অবস্থায় আমি নাকি ওর বান্ধবীর রুমে গিয়ে শুয়ে পড়ব।

আমি খুবই হতাশ হয়ে গেলাম। মাঝসমুদ্রে বসেও এই বোকাচোদার হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো উত্তর না দিয়ে আমি নিচে নেমে যাচ্ছি। পেছন ফিরে দেখি, বোকাচোদাটা আমার পিছে পিছে আসছে।

– জারিফ, তুমি উপরে যাও, প্রোগ্রাম শুরু হয়ে যাবে।
– ভাই, আপনাকে দেখে অনেক টায়ার্ড লাগতেসে। আপনাকে কেবিনে সেট করে দিয়ে যাই।
– জারিফ।
– জি ভাই।
– এখান থেকে যাও।
– আচ্ছা ভাই।

আরও কয়েক মাস চলে গেল। দেখা গেল, এই বোকাচোদা শুধু স্যাসড়া না, সে একজন বিরাট মাগীবাজ। প্রতিদিন বিকেলে তাকে ফুলবাড়িগেট চা-দোকানে বান্ধবীদের সাথে চা খেতে দেখা যায়। এবং সেখানেও তাঁর হাত থেকে নিস্তার পাওয়া যায় না। আমাদের রুমের কাউকে দেখলেই সে মেয়েদের ছেড়ে আমাদের সাথে কথা বলতে চলে আসে। গম্ভীর মুখে জিজ্ঞেস করে, “ভাই, কী খবর?”

আমি প্রচণ্ড বিরক্ত হই। কী দরকার তোমার নারীসঙ্গ ত্যাগ করে আমাদের সাথে গ্যাজানোর? এই বোকাচোদার অত্যাচারে একদম অতিষ্ঠ হবার অবস্থা। মনে হচ্ছে, একদিন ডেকে কঠিন র‍্যাগ দিতে হবে। বিরক্তি চরম সীমায় পৌঁছেছে।

আমরা সবাই বিরক্ত হতাম, কিন্তু আমার রুমমেট রুম্মান জারিফকে খুব আদর করত। রুম্মান এই ছেলের মধ্যে কী দেখেছে, কে জানে। কিন্তু দেখা গেল, সেই আদরও এই বোকাচোদার বেশি দিন সহ্য হল না।

কিছুদিন পর ছাত্রলীগের সম্মেলন ছিল। নতুন কমিটি দেওয়া হবে। ক্যাম্পাসের চারদিকে ব্যাপক হৈচৈ। সেই হৈচৈয়ের মধ্যে এক সকালে রুম্মান দেখল, অডিটোরিয়ামের সামনে জারিফ ছাত্রলীগের ছেলেদের সাথে বসে আছে।

এই বোকাচোদা কবে ছাত্রলীগে জয়েন করেছে, রুম্মান কিছুই জানে না। এদিকে রুম্মান কঠিনভাবে স্টুডেন্ট পলিটিক্স অপছন্দ করে। সে প্রচণ্ড রেগে গেল।

রুম্মান রেগে গেলে তাকে সহজে বোঝানো যেত না। বোকাচোদা জারিফ বুঝতে পারল, তাঁর পলিটিক্সে যোগ দেওয়ায় রুম্মান মন খারাপ করেছে। সে রাতের বেলা রুম্মানের মন ভাঙাতে লালন শাহ হলে চলে আসলো।

আমি সে রাতে খুবই চোদ। এর মধ্যে ৫ ফিট ৩ ইঞ্চির এই টাক বোকাচোদাটা রুমে ঢুকছে দেখেই আমি প্রচণ্ড বিরক্ত হলাম।

জারিফ রুম্মানের মন ভাঙাতে পারল না। কিন্তু যাওয়ার সময় সে একটা নেইল কাটার নিয়ে নিজের পায়ের নখ কেটে ফাহিদ ভাইয়ের বেডে নখ ছড়িয়ে চলে গেল।

ফাহিদ ভাই আমারও দুই ব্যাচ সিনিয়র। লগ খেয়ে ক্যাম্পাসে পড়ে আছেন। সারাদিন গেইম খেলেন আর পরীক্ষার সময় ঘুমিয়ে থাকেন। কোনো এক হলে গেম খেলা শেষ করে ফাহিদ ভাই রুমে আসলেন।

উনি বিছানায় বসেই দেখেন, পুরো বিছানায় নখ ছড়ানো। জারিফ ফাহিদ ভাইয়ের ৪ ব্যাচ জুনিয়র। ইয়ার্কিরও তো একটা লিমিট আছে!

জারিফের ডাক পড়ল।

সে রাতে প্রবল বৃষ্টি হচ্ছিল। সেই বৃষ্টিতে ভিজে জারিফ আমাদের রুমে ফেরত আসল। এরপর যা হবার তাই হল, সবাই মিলে জারিফকে উদুম বুদুম লাগানো হল।

“তোমাকে কি কেউ সিভিক সেন্স শিখায় নাই?” “তোমাকে তো এখন ফ্যানে ঝুলায় র‍্যাগ দেওয়া দরকার” “তোমার ইমিডিয়েট সিনিয়ররা কিছু শেখায় নাই? ওদেরও র‍্যাগ দেওয়া দরকার” “ছাত্রলীগে জয়েন কইরা কি শ্যাটা হইয়া গেস নাকি? ছাত্রলীগ পিছে দিয়া ভইরা দিব তোমার” ইত্যাদি।

পুরোটা সময় জারিফ চুপ করে শুনে গেল। একটা কথাও বলল না। চোদ থাকার কারণে আমার সেদিন কিছু বলতে ইচ্ছে করছিল না। রুমের লাইট বন্ধ ছিল। আমি অন্ধকারে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে ছিলাম।

এক পর্যায়ে জারিফকে রুম থেকে বের করে দেওয়া হল।

ছেলেটা এবার আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, বাইরে তো অনেক বৃষ্টি, যদি কিছু মনে না করেন, আমি এখানে একটু কিছুক্ষণ থাকি? ভিজে গেসি তো, বৃষ্টি থামলে চলে যাব।”

বোকাচোদা জারিফ, রুম্মানের বেডের এক পাশে চুপ করে বসে আছে। রুমের লাইট বন্ধ। বাইরে ঝড় হচ্ছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। আহা, খুলনার সেই বিখ্যাত বৃষ্টি! আকাশের ট্যাপ খুলে দিয়ে কেউ ভুলে গেছে।

জারিফ জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে। তাঁর চোখে গভীর বিষাদ। আমি ছেলেটার দিকে তাকালাম। এই প্রথম ছেলেটার জন্য আমার মায়া হতে লাগল।

বৃষ্টি কমা শুরু হয়েছে। এক সময় জারিফ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে উঠে বের হয়ে গেল।

দু'দিন পর আমার জারিফের সাথে দেখা। কেন জানি আমার কিছুটা খারাপ লাগল। ছেলেটা দেখা হলে আর কিছু বলবে না, মাথা নিচু করে চলে যাবে।

জারিফ মাথা নিচু করে চলে যাচ্ছিল। যাওয়ার সময় আমার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভাই, আমার বিশ টাকা।”

আমি জারিফকে ডাক দিলাম। আমার এখনো মনে আছে, সেদিন সন্ধ্যা ছিল। প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছিল।

সেই সন্ধ্যা থেকে রাত ২টা পর্যন্ত সেদিন আমি জারিফের সাথে গল্প করেছিলাম। সে রাত থেকে আমার জারিফ জামান খন্দকারকে চেনা শুরু।

জারিফের বিষয়ে আমার একটা ধারণা একদম ঠিক। সে আমার লাইফে দেখা সবচেয়ে বড় বোকাচোদা। কিন্তু এর বাইরে একটা ধারণাও ঠিক না। জারিফ মাগীবাজ না। এই মেয়েগুলা জারিফের বন্ধু। একটা সময় আমি বুঝতে পারলাম, জারিফ এদের ঠিক অন্য ছেলে বন্ধুদের মতই দেখে।

এই বোকাচোদা ছ্যাঁচড়াও না। ছেলেটার বাবা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিরেক্টর। ঢাকা শহরের সবচেয়ে বনেদি কয়েকটা পরিবারের একটায় এই বোকাচোদার জন্ম। তারা শান্তিনগরের স্থানীয়। চাচা, ফুপারা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। বনেদি শিক্ষিত ধনী পরিবার।

ছেলেটা জাস্ট ফান্ডামেন্টালি বিলিভ করে, সিনিয়রদের সামনে নিজে বিল দেওয়া একটা চরম বেয়াদবি। এই বেয়াদবি সে করতে পারবে না।

আমি কখনো দেখি নাই, জারিফ জামান থাকা অবস্থায় তাঁর কোনো জুনিয়র পকেটে হাত দেওয়ার সাহস করেছে। আমি এটাও দেখি নাই, আমরা কেউ থাকা অবস্থায় জারিফ পকেটে হাত দিয়েছে। সেটা ১৮ বছর বয়সে যেমন দেয় নাই, ৩২ বছর বয়সেও দেয় নাই।

আস্তে আস্তে বিশ্ব বোকাচোদা জারিফ আমার খুব কাছের মানুষ হয়ে গেল। সে একটুও বদলায় নাই। হ্যাঁ, তবে সে এখন ২০ টাকা থেকে ২২ টাকায় প্রোমোশন নিয়েছে। কারণ বেনসনের দাম ২ টাকা বেড়ে ১৭ টাকা হয়েছে।

বোকাচোদাকে আমি রোজ ক্যাম্পাসে একটা কলারওয়ালা গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরে ঘুরতে দেখি। হাইটের কারণে সেই হাফ প্যান্ট তাঁর টাখনু পর্যন্ত চলে আসে। গম্ভীর মুখে সে নেতা নেতা ভাব নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরঘুর করে।

মাঝেমধ্যে তাঁকে আর তাঁর বন্ধু অয়ন গোলদারের মধ্যে আমি গোলমাল করে ফেলি। দুইজনের চেহারা সেইম, হাইটও সেইম; দুজন ই টাক। কিন্তু স্বভাব একদম আলাদা।

অয়ন গোলদার আমার লাইফে দেখা সবচেয়ে পিনিকবাজ ছেলেদের একজন। সে সারাক্ষণ একে ওকে পিনিক দিচ্ছে। আর জারিফের হাবভাব ইউনিভার্সিটির প্রফেসরদের মতো। কিন্তু এঁদের দুজন চরম বন্ধু। দুজন একসাথে ঘোরে। দেখা হলে একজন সারাক্ষণ হাসে, আরেকজন গম্ভীর মুখে তাকিয়ে থাকে।

সময়-অসময়ে বোকাচোদা জারিফ আমার কাছে আসে, বুদ্ধি-পরামর্শ নিতে। বেশিরভাগ সমস্যাই তাঁর নিজের তৈরি করা। কিন্তু তাঁকে কোনোভাবেই বোঝানো যায় না যে সমস্যাগুলা তাঁর তৈরি। সে সিরিয়াস মুখে বলতে থাকে, “কিন্তু ভাই, আমি এটা না করাটা তো এথিকালি ঠিক হয় না। আমার তো এটা বলা দরকার ছিল, তাই বলসি। না বললে ওই ছেলেটা অসহায় ফিল করত।”

আমি এই বোকাচোদাকে নিয়ে এদিক-ওদিক যাই। কয়দিন সে আমার ছবি তোলা দেখবে বলে ঝুলে থাকল। ছবি তোলার ব্যাপারে তাঁর কোনো আগ্রহ নাই। কিন্তু সে নাকি আমার সাথে ঘুরতে চায়।

আমি জারিফকে নিয়ে খুলনা শহর যাই। ফরেস্ট ঘাটে বসে থাকি। একদিন ভৈরব পার হয়ে দিঘোলিয়া চলে গেলাম। ভ্যানে উঠে চলতে চলতে চিত্রার পাড়ে পৌঁছে গেলাম।

সেখানে নদীর ধারে এক মেলা থেকে কটকটি খেয়ে সে বমি করা শুরু করল। তাঁকে ভ্যানে শুইয়ে আমি ক্যাম্পাসে নিয়ে আসলাম। আচ্ছা, আপনারাই বলেন তো, কোন জুনিয়র তাঁর সিনিয়র বড় ভাইকে এত যন্ত্রণা করে? একটা মানুষ কোন পর্যায়ের বোকাচোদা হলে রেগুলার এসব সমস্যা তৈরি করা সম্ভব?

এক সময় আমি ফাইনাল ইয়ারে উঠলাম। সব কিছু আস্তে আস্তে বদলে যাচ্ছে। ছেলেদের সবার হাতে এখন স্মার্টফোন। আগের মত কেউ আড্ডা দেয় না। রুমে রুমে সবাই নেশা পানি করে। নেশা শেষে মোবাইল গুতায়।

সব বদলে যাচ্ছে, কিন্তু জারিফ জামানের লাইফ বদলায় নি। এবার সে এক অভিনব সমস্যা নিয়ে হাজির হল।

ক্যাম্পাসের তৎকালীন ছাত্রলীগ প্রেসিডেন্ট এক জুনিয়র মেয়ের প্রেমে পড়েছেন। মেয়েটির নাম ছিল একটা ফুলের নামে। প্রেসিডেন্ট বড় ভাই সেই ফুলের একটা বাগান করলেন DSW বিল্ডিংয়ের সামনে।

আমার কিছু বন্ধু-বান্ধবের পিনিকে তিনি সেই মেয়েকে ক্যাফেটেরিয়াতে ডেকে প্রোপোজও করলেন। প্রোপোজ করার আগে আমাদের সামনে উনি রিহার্সেল দিয়েছিলেন। সেই রিহার্সেল উনার অজান্তে রেকর্ড করা হয়েছিল।

কুয়েটে সেটা এক অদ্ভুত পিনিকের সময় ছিল। উনি একদিন তামিল ফিল্ম স্টাইলে খালি গায়ে ব্যাটারি রিকশা চালিয়ে মেয়েটার সামনে স্ট্যান্ট দেখিয়েছিলেন। আমরা রোজ অপেক্ষা করতাম, "আজকের পিনিক কী?"

সেই বড় ভাই কেন জানি আমাকে বেশ স্নেহ করতেন। রোজ উনি মেয়েটাকে ৩টা মেসেজ পাঠাতেন। সেই মেসেজ পাঠানোর আগে আবার ড্রাফট করে আমাকে দেখাতেন।

কখনো সেই মেসেজগুলো নিয়ে বইমেলায় একটা বই বের হলে সেটা নির্ঘাত বেস্ট-সেলার হত। আমি একদিন উনাকে বললাম, “ভাই, রোমান্টিক মেসেজ দিয়া কাজ হবে না। আপনি ইনফরমেটিভ মেসেজ দিতে পারেন। না হলে বোরিং হয়ে যাচ্ছে।”

বড় ভাই পরদিন আমাকে একটা মেসেজ ড্রাফট করে দেখালেন। মেসেজে লেখা, “গাছ বলে আমি সবুজ। পাখি বলে আমি অবুঝ। আমি বলি, তুমি কেমন আছ?”

আমি বললাম, “ভাই, খুব ইনফর্মেটিভ। সেন্ড করে দেন।”

খুব সুন্দর দিন কাটাচ্ছিলাম আমরা। প্রতি মিনিটে ক্যাম্পাসে কোনো না কোনো পিনিক হচ্ছিল। ভাই কখন কী করবেন, কেউ জানে না। মেয়েটার জন্মদিনে ভাই ঠিক করলেন, উনি আকাশে বাজি ফুটিয়ে সেই মেয়ের নাম লিখবেন। এ ধরণের বাজি নাকি ইন্ডিয়াতে এভেইলেবল। বাজি খোঁজার জন্য বেনাপোলে যোগাযোগ করা হল।

সবাই ভাইকে খুব উৎসাহ দিল। সবাই উনাকে স্বাভাবিকভাবেই ভয় পেত। যা বলতেন, তাতেই হ্যাঁ তে হ্যাঁ মিলাত। ভাই সবচেয়ে বেশি ঝাড়ি দিতেন ছাত্রলীগের ছেলেদের। বরং ছাত্রলীগ করি না দেখে মনে হয়, আমার আর আমার বন্ধু আকাশের কথা উনি কিছুটা শুনতেন।

আমাদের মনে হল, বাজি ফুটিয়ে নাম লেখাটা আসলে একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে। মেয়েটা পাবলিক শেমিংয়ে পড়বে। আমি, আমার বন্ধু নাশিন আর আকাশ মিলে ভাইয়ের সাথে দেখা করলাম। ভাইকে বললাম, “ভাই, এটা করলে বাজির ভিডিও ভাইরাল হয়ে যাবে। পরে সেন্ট্রালে জানাজানি হবে। আপনার কমিটি বাতিল হয়ে যেতে পারে।”

ভাই অনেকক্ষণ ভাবলেন। এরপর আমাদের বললেন, “এ জন্যই তোমাদের ভরসা করি। আমার সংগঠনের ছেলেরা আমারে এই ব্যাপারে সাবধান করত না।”

এর মধ্যে বড় ভাই খবর পেলেন, তাঁর প্রেয়সী জারিফ জামান খন্দকারের অত্যন্ত কাছের বান্ধবী। জারিফের ওপর দায়িত্ব পড়েছে; মেয়েটির সাথে ভাইকে যেভাবেই হোক প্রেম করিয়ে দিতেই হবে। জারিফকে ১৫ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হল।

জারিফের লাইফ হেল হয়ে গেছে। ছাত্রলীগের কোনো প্রোগ্রামে জারিফ ভয়ে যায় না, যদি ভাইয়ের সাথে দেখা হয়ে যায়। যখনই দেখা হয়, ভাই জারিফকে কাউন্টডাউন দেন, “তোমার হাতে সময় আর ১২ দিন।” “আর বাকি ৯ দিন।”

জারিফ আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছে। আমি আর আকাশ বসে আছি। আকাশ আমার স্কুল ফ্রেন্ড। স্কুলের বড় ভাই হবার কারণে আকাশকেও অনেকবার জারিফের বিশ টাকা বিল দিতে হয়েছে। জারিফ তদবির নিয়ে এসেছে আমাদের কাছে: বড় ভাইকে রিকুয়েস্ট করে জারিফকে মুক্তি দিতে হবে। আমি জারিফকে একটাই প্রশ্ন করলাম,

– তুই ছাড়াও ওই মেয়ের আরও অনেক ছেলে বন্ধু আছে, যারা ছাত্রলীগ করে। তোর কী মনে হয়, তোরে ভাই এমনে ছাই দিয়া ধরসে কেন?
– ভাই, জানি না। মনে হয়, ভাইয়ের ধারণা আমি বললে কাজ হবে।
– না, এই কারণে না।
– তাইলে কী কারণে ভাই?
– কারণ তুই বোকাচোদা।
– এটা কী বললেন ভাই?
– ভাই জানে, অন্য কাউকে বললে সে বলবে, ভাই আমি বলসিলাম, মেয়ে আমার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিসে। কিন্তু তুই গিয়া ভাইরে মিথ্যা কইতে পারবি না। এর মানে এই না যে তুই সাধু। তুই বোকাচোদা। ভাই খুব ভালো করে জানে, তাঁর জন্য তুই-ই সঠিক ব্যক্তি।

জারিফ অনেকক্ষণ হা করে আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। এরপর মুখ বন্ধ করে বলল,

– কিন্তু ভাই, উনি আমার সংগঠনের প্রেসিডেন্ট, আমি উনাকে মিথ্যা কেন বলব? এটা কেমন কথা?
– জারিফ।
– জি ভাই।
– তুই আমার সামনে থেকে যা এখন।
– ভাই, আমি কি কিছু বেয়াদবি করসি?
– তুই যা।
– জি ভাই।

আকাশ আর আমি বড় ভাইকে বুঝিয়েছিলাম। ভাই জারিফকে ডেকে কঠিন ঝাড়ি দিলেন,

– তুমি রাফিদ আর জহুর আর ইন্তেখাব আকাশকে বিচার দিসো, আমি তোমারে বিপদে ফেলসি? আমি কি তোমারে প্রেশার দিসি? ওরা কী ভাবল, আমি তোমার সাথে কী না কী করসি। যাও এখান থেকে, আর এই মেয়ের ব্যাপারে তোমার কিছু করতে হবে না। তবে ওর সাথে দেখা হলে আমার সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলবা। কেমন?
– জি ভাই।
– নাও, সিগারেট খাও।
– থ্যাংক ইউ ভাই।
– সিগারেট নিয়ে এখান থেকে চলে যাও। তোমাকে দেখলেই রাগ হচ্ছে।
– জি ভাই।

এত কিছুর ভিড়েও জারিফ পড়াশোনায় খুব ভালো করতে থাকল। কুয়েটের সিভিল ডিপার্টমেন্টে তাঁর সিজিপিএ ৩.৫। রেফারেন্স হিসেবে আমার সিজিপিএ বললে আপনাদের কাছে ৩.৫-এর মাহাত্ম্য ক্লিয়ার হবে। আমার সিজিপিএ ২.৭৪।

জারিফ নিজে পড়ে, এরপর তাঁর বান্ধবীদের পড়াতে লাইব্রেরিতে যায়। অন্যদের যেটা পড়তে ৬ ঘণ্টা লাগে, জারিফ সেটা ১ ঘণ্টায় পড়ে। লাইব্রেরি থেকে এসে আবার রুমমেটদের পড়ায়। এনভায়রনমেন্ট পরীক্ষা আমি দেই নাই। পরে এই সাবজেক্টে জারিফদের সাথে আমার পরীক্ষা ছিল। জারিফ আমাকে ৩ ঘণ্টা পড়িয়ে ৩ ঘণ্টার পরীক্ষায় পাশ করিয়ে দিল।

কুয়েটে সিভিল ডিপার্টমেন্টে একটা অলিখিত নিয়ম আছে। আপনি আপনার সবচেয়ে কাছের সিনিয়রকে তুমি করে বলতে পারবেন। জারিফ আমাকে ‘তুমি’ বলা শুরু করল।

একদিন খবর পেলাম, সে ডিপার্টমেন্টের ফুটবল টিমের ম্যানেজার হয়েছে। সেই টিম ফাইনালেও উঠেছে। আমাকে নাকি অবশ্যই যেতে হবে। যাওয়ার কোনো ইচ্ছা নাই। আমি জানি, না গেলে এই ছেলে মন খারাপ করবে না। কিন্তু এই বোকাচোদা ভাববে, আমি কিছু নিয়ে তাঁর ওপর বিরক্ত হয়েছি। সেই বিরক্তি ভাঙাতে এসে আরও বিরক্ত করবে।

ভয়ে মাঠে চলে গেলাম। জারিফের টিম চ্যাম্পিয়ন হয়ে গেল। বোকাচোদা ট্রফি হাতে নিয়ে বসে আছে। তাঁর মুখে কোনো হাসি নেই। গম্ভীর মুখে আমার কাছে নিজের প্লেয়ারদের সুনাম করছে। হাবভাব কার্লো আনচেলত্তি’র মতো।

বন্ধে আমি ঢাকা আসি। সেখানেও জারিফ চলে আসে। তখন আমি খিলগাঁও থাকতাম। জারিফ কখনো একা থাকতে পারে না। প্রতিদিন সাথে তাঁর স্কুলের বন্ধুদের নিয়ে আসে। আমরা বসে ঝিমাই। এভাবেই আমার জারিফের সবচেয়ে কাছের বন্ধু মুন্নার সাথে পরিচয়। মুন্না নেভি অফিসার। ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে। জীবনের পুরোটা সময় তাঁর এই বোকাচোদা জারিফের সাথেই কেটে গেল।

আস্তে আস্তে মুন্নাও জারিফের মতো ক্লোজ হয়ে গেল।

(শেষ অংশের লিংক প্রথম কমেন্টে দেয়া আছে)

Address

Romna
Dhaka
1207

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Rafid Al Zahur posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Contact The Business

Send a message to Rafid Al Zahur:

Share

Category