15/05/2026
বোকাচোদা [শেষ পর্ব]
(প্রথম পর্বের লিংক প্রথম কমেন্টে দেয়া আছে। ঐ পর্ব না পড়লে এই লেখা পড়ার দরকার নাই।)
আমি কুয়েট থেকে চলে আসলাম। কিন্তু জারিফ আমাকে বিপদে ফেলা বন্ধ করল না। জারিফের সাথে লাইফে যে-ই মিশেছে, সে-ই বিপদে পড়েছে। আমি অন্তত ১০০টা ঘটনা বলতে পারব, যেখানে জারিফ মানুষকে শুধু তাঁর সাথে থাকার জন্য বিপদে ফেলেছে।
এবং সবচেয়ে সমস্যার ব্যাপার হচ্ছে, আপনি জারিফের ওপর ক্ষেপতে পারবেন, কিন্তু ওকে দোষ দিতে পারবেন না। কারণ বোকাচোদার নিয়ত একদম ঝরনার পানির মতো পরিষ্কার।
ঝরনার কথায় মনে পড়ে গেল: ১৬ সালে সিলেট গিয়েছি। সাথে রুম্মান আর ভোটকা অনিক। কই থেকে খবর পেয়ে এখানেও চলে এসেছে জারিফ জামান খন্দকার। সাথে নিয়ে এসেছে তাঁর রুমমেট আবু সালেহ রাহাতকে।
আমরা উঠেছি আমার বন্ধু হেভেন চাকমার বাসায়। বোকাচোদাটা সেখানেও হাজির। কোথাও আমার মুক্তি নাই।
বিকেলে জাফলংয়ের দিকে যাব। জারিফ দাবি করল, নতুন একটা ঝরনা আছে। আমাদের সেখানে অবশ্যই যাওয়া উচিত।
বর্ডারে এসে নৌকা থেকে নামলাম। গুগল ম্যাপ দেখে হেঁটে হেঁটে সেই ঝরনা খুঁজছি। এক পর্যায়ে আমাদের মাঝি বলল, “মামা, আর আগাইবেন না, সামনে ইন্ডিয়া।”
জারিফের ঝরনা তখনো দেখা যাচ্ছে না। সে দাবি করল, সামনে আগালেই দেখা যাবে। গুগল ম্যাপ নাকি সেটাই বলছে। আমাদের অবশ্যই যাওয়া উচিত। এই রিস্ক নেয় কেউ? আমি না করে দিলাম।
কে শোনে কার কথা? রুম্মান কে নিয়ে ততক্ষণে জারিফ এগিয়ে গেছে। এদিকে আমরা তিনজন কি করব ভাবছি। পেছন ফিরে দেখি, আমাদের মাঝি উল্টো দিকে দৌড় লাগিয়েছে।
এবার সামনে তাকিয়ে দেখি, দূরে রুম্মান আর জারিফ নীল ডাউন করে বসে আছে। তাদের দুজনের সামনে দুজন সৈনিক। সৈনিকদের হাতে রাইফেল। রাইফেলের নল এই দুই বোকাচোদার মাথায় তাক করা।
সৈনিক দুজন বিএসএফের। জারিফ এবং রুম্মান এখন ইন্ডিয়ায়। আমরা বাকি ৩ জন নো ম্যানস ল্যান্ডে দাঁড়ানো।
আমাদের দূর থেকে সৈনিকরা হাত দিয়ে ডাকছে। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে এগিয়ে গেলাম।
বিএসএফ জওয়ানরা আমাদের লাইন ধরে নীল ডাউন করিয়ে রেখেছে। আমি জারিফের দিকে তাকিয়ে আছি। এই বোকাচোদাকে নিছক ভালোবাসি বলে আমাকে আর কত কাফফারা দিতে হবে?
আমাদের ব্যাগ, মোবাইল সব জব্দ করা হল। মনে হয়, ধরে চালান করে দিবে। এরপর স্পাই বলে তিহার জেলে পাঠায় দিবে।
মারার হলে তো মেরেই ফেলত। আসার সময় শুনেছি, কালকে সকালেই নাকি এক গরুর ব্যাপারীকে শুট করে মেরে ফেলেছে বিএসএফ। এরা এই বর্ডারে পাখির মতো বাংলাদেশি মারে। এসব এদের কাছে কোন বিষয় না। বোকাচোদা জারিফের জন্য আমাকে এই বয়সেই মরতে হবে?
নীল ডাউন হয়ে এসব ভাবছিলাম। হুট করে একজন সৈনিক আমাকে জিজ্ঞেস করল,
– ইধার কিউ আয়া?
– We are Bangladeshi tourists, we didn’t know it’s India.
– হিন্দি মে বাত কর, বেহেনচোত।
– গালতি হো গায়া, ছোড় দো।
সৈনিক দুজন নিজেদের দিকে তাকিয়ে বলল,
– কারতে কেয়া হো?
– ইঞ্জিনিয়ারিং কারতা হু, স্টুডেন্ট হু।
– ইঞ্জিনিয়ার বানো গে, ইন্টারন্যাশনাল বর্ডার কে বারে মে পাতা নেহি হ্যায়?
– সরি।
– ইধার কিউ আয়া?
– এক ঝরনা ঢুঁন্ড রাহা হু।
– আচ্ছা, বাহুত খুব। কাহা হ্যায় ভো ঝরনা?
আমরা তখনো নীল ডাউন করে বসে আছি। আমাদের সামনে বন্দুক তাক করে দুইজন সৈনিক প্রশ্ন করছে। এই সময় জারিফ জামান খন্দকার খুব সিরিয়াস কণ্ঠে বলল,
– আগার আপ মেরে মোবাইল দো গে, তো ম্যায় আপকো দেখাউঙ্গা, ইধার এক ঝরনা হ্যায়। ম্যায় শিওর হু।
আমি নীল ডাউন করে না থাকলে এই বোকাচোদাকে উড়ে এসে একটা লাথি মারতাম। তবে সেটাও মনে হয় মিস করতাম; আমার পা এই দেড় ফুটিয়া বোকাচোদার মাথার ওপর দিয়ে চলে যেত।
সৈনিকদের একজন জারিফের দিকে তাকালেন। এরপর তাঁর কলিগের দিকে তাকিয়ে বললেন, “ইস গাঞ্জে কি ব্যাগ চেক কার।”
জারিফের ব্যাগ চেক করা হল এবং সেখান থেকে ২৫ গ্রাম গাঁজা পাওয়া গেল।
হাতে ২৫ গ্রাম সিলেটি সস্তা গাঁজার পোটলা নিয়ে বিএসএফ জওয়ান জারিফের দিকে তাকিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করল,
– কেয়া হ্যায় ইয়ে?
– টোব্যাকো হ্যায়।
– আচ্ছা, ইয়ে টোব্যাকো হ্যায়?
– হা।
– ইসে কেয়া কারতে হ্যায়?
জারিফ গম্ভীর গলায় বলল, “সিগারেট মে ভারকে স্মোক করতে হ্যায়।”
আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। আর কোনো আশা নাই।
জারিফ আমাকে কানে কানে বলল, “ভাই, এটা গাঁজার পোটলা। কিন্তু ভিতরে হ্যাশ নাই, সিগারেটের সুগার। টেনশনের কিছু নাই। আমি রেখে দিসিলাম। এদিকে তো দোকান নাই, পরে তোমরা রিজলা বানাইতে চাইলে সুগার পাবা না তাই।”
একটা ছেলে গাজার পোটলায় সিগারেটের টোবাকো ভরে ব্যাগে রেখে ঘুরছে। এরপর সেটা নিয়ে বর্ডার ক্রস করে বিএসএফ এর কাছে কট খেয়েছে।
আমার ইচ্ছে হল বিএসএফ জওয়ানকে ডেকে বলি, “এই বোকাচোদারে প্লিজ আপনি শুট করেন। আর আপনি না করতে চাইলে আমাকে দেখান কীভাবে গুলি করতে হয়। আমি এই চুদির ছেলেকে ৩৬টা গুলি করতে চাই।”
ওরা মনে হয় বুঝতে পারল, এটা সুগার। একজন জওয়ান বলল, “হামারে সাথ আও।”
আমরা উঠে দাঁড়িয়ে ওদের পিছে পিছে হাঁটতে লাগলাম। এখন কই নিয়ে যাবে? বাসায় একটা খবর তো দেওয়া দরকার ছিল। কী করব?
যেতে যেতে একটা খালের পাশে আমাদের থামতে বলা হল। জারিফ আমাকে বলল, “ভাই, ৭১-এ খালের পাশে নিয়ে শুট করে দিত। এখন মনে হয় শুট করে দিবে।”
কেউ এই বোকাচোদাকে ছেড়ে দেন প্লিজ। ও বাসায় চলে যাক। আমি ওর সাথে দেশে ফিরব না। আমি নিজ দায়িত্বে ইন্ডিয়ান হাজতে ঢুকে যাচ্ছি। তবুও এই বোকাচোদার বাটখারার সাথে আর এক মিনিট আমি থাকতে রাজি না।
জওয়ান দুজন আমাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ইয়েহ হ্যায় ভো ঝরনা, জিতনা মারজি দেখো, পানি পিও, উসকে বাদ ঘর যাও। বেটা, কাভি বর্ডার ক্রস মাত কারনা, হামে পতা হ্যায়, তুমলোগ ট্যুরিস্ট হো। জঙ্গল সে হাম পনেরা মিনিট তাক তুম লোগো কো দেখা ইধার আতে হুয়ে। যাও, এঞ্জয় কারো।”
আমরা যতক্ষণে নো ম্যানস ল্যান্ড ক্রস করে দেশে ঢুকেছিলাম, ততক্ষণে সিলেটের ডিসি অফিস পর্যন্ত খবর চলে গিয়েছিল। জাফলংয়ের রাস্তার সব সিএনজি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। আমাদের যে সিএনজি ড্রাইভার নিয়ে এসেছিল, তাকে বাজারে বেঁধে রাখা হয়েছিল।
বিডিআর আমাদের ১ ঘণ্টা ধরে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। মনে আছে, বিএসএফের সৌজন্যে ফ্রিতে ইন্ডিয়া ঘুরে এসে বিডিআরকে নাস্তা খরচ বাবদ ১০০০ টাকা দিতে হয়েছিল।
এই সব হয়েছিল শুধুই জারিফ জামানের জন্য। ফেরার পথে আমি প্রচণ্ড রেগে ছিলাম। জারিফকে বললাম, “এই ঘটনা যেন কেউ না জানে।”
আমি সিলেট শহরে ফেরার আগে জারিফ জামান এই ঘটনা পুরো কুয়েটমহলে ছড়িয়ে দিয়েছিল। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, সবাই কীভাবে জানল, সে গম্ভীর মুখে বলেছিল,
“ভাই, বিষয় হচ্ছে হইল, তুমি বলার আগেই আমি দুই-একজনকে বলে ফেলসিলাম। তুমি মানা করার পর আমি কাউকে কিছু বলি নাই। ভাই তুমি নিশ্চিন্তে থাকতে পারো।”
২০১৯ সালে আমি বেইলি রোডের দিকে শিফট করলাম। জারিফ এখন আমার একমাত্র প্রতিবেশী। রোজ দুই বেলা করে জারিফের সাথে চা-বিড়ি খাই। সে রোজ নতুন নতুন বিপদে পড়ে, সেসবের সমাধান দেই। সব ই আসলে টাইম পাস।
রোজ নতুন নতুন ছেলেদের সাথে আমার পরিচয় হয়। এরা সবাই জারিফের কুয়েটের জুনিয়র। আমার চেয়ে অনেক ছোট, আমি এঁদের কাউকে চিনি না।
এঁদের একজন রোজ আমাদের সাথে আড্ডা দিতে আসে। একদিন সেও আমাকে তুমি করে বলা শুরু করল। রাতে দেখি সেই ছেলে আমাকে ফোন দিয়েছে।
– ভাই, আমি আপনাকে তুমি করে ডাকসিলাম। আমি খুবই সরি। আমার ঠিক হয় নাই।
– আরে, কী হইসে তাতে? আবার ফোন দিয়ে সরি বলার কী আছে এখানে?
– আপনি যাওয়ার পর জারিফ ভাই আমাকে ২ ঘণ্টা র্যাগ দিসে, ভাই। পাশ করে বের হবার পর র্যাগ খেয়ে গেলাম, ভাই।
– বলো কী!
– জি ভাই, আমাকে মাফ করবেন প্লিজ।
এর মধ্যে বোকাচোদা জারিফ জানালো, সে বিসিএসের প্রিপারেশন নিচ্ছে। সে বাপ-মা ছেড়ে আমেরিকা যাবে না। এটা তাঁর মোরাল গ্রাউন্ডের সাথে যায় না।
কিছুদিন পর বোকাচোদাটা বিসিএস প্রিলিতে ফেল করল। এদিকে কুয়েটের গরু-গাধাদেরও বিসিএস হয়ে যাচ্ছে। আমি জারিফের উপর খুবই বিরক্ত হলাম।
যে জারিফকে আমি চিনতাম, এই ছেলে সে না। জারিফের পড়াশোনায় কোনো মন নাই। সারাদিন জুনিয়রদের সময় দেয়। জুনিয়ররা ঢাকায় এসে জারিফের বাসাতেই থাকে। এরা জারিফের বাসায় বসে পড়াশোনা করে, জারিফ নিজে তখন বাসায় থাকে না। সে তাঁর স্কুলের বন্ধুদের সাথে বাইরে ঘোরে। আমার সাথে দেখা হলে আমি ঝাড়ি দেই, তাই আমার সাথে বেশিক্ষণ থাকে না।
বোকাচোদার নিজের কোনো চাকরি নাই, কিন্তু সে এর-ওর জন্য তদবির করে বেড়ায়। আমার এক বন্ধুর পোস্টিং সে আংকেলকে বলে ঢাকায় করে দিল। জারিফের এক স্কুল ফ্রেন্ড PWD-তে জয়েন করেছে। তাঁর পোস্টিং ঢাকায় কীভাবে করা যায়, সেই ব্যাপারে সে আমার সাথে দেখা করতে এসেছে। তাঁর দাবি, আমাকে আমার বাপের কাছে ঐ ছেলের পোস্টিংয়ের জন্য তদবির করতে হবে। জারিফের এসবে আমি ততদিনে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। আমি জানি, বিরক্ত হয়ে কোনো লাভ নাই।
একদিন জারিফ এসে জানালো, ঢাকায় তাঁর পড়াশোনা হচ্ছে না, সে কুয়েট চলে যাবে। এবং আমি অবাক হয়ে দেখলাম, সে কুয়েট চলে গেল। সেখানে সে লেখাপড়ার নামে জুনিয়রদের সমস্যা সমাধান করা শুরু করল। আজকে এই গ্রুপের অমুক আরেক গ্রুপের তমুককে থ্রেট দিয়েছে। মিউচুয়াল কে করবে? জারিফ জামান।
কালকে হল কমিটি নিয়ে গ্যাঞ্জাম। মিউচুয়াল কে করবে? জারিফ জামান। খবর পেয়ে আমি এবার ক্ষেপে গেলাম। বোকাচোদাটাকে ফোন দিলাম।
– কী শুরু করসস তুই?
– কেন ভাই? কী হইসে?
– তুই তো ৪ বছর ছাত্রলীগ করসস। ১টা পয়সাও তো পকেটে ঢুকাস নাই, উল্টা লোকজনরে হেল্প করতে গিয়া বিপদে পড়সস। এখনো শিক্ষা হয় নাই? এখনো তোর ক্যাম্পাসের পলিটিক্সে নাক গলানোর দরকার আছে?
– ভাই, এরা আমার জুনিয়র। এঁদের আমি রাজনীতিতে নিয়া আসছি। এঁদের সমস্যায় আমি থাকব না?
– এই বোকাচোদা, তুই না খুলনা গেসস পড়াশোনা করতে?
– ভাই, করতেসি তো। তুমি টেনশন কইরো না। আমার একটা কিছু হয়ে যাবে।
২ মাস পর জারিফ ঢাকা ফেরত আসলো। কিন্তু খুলনা শহর ছেলেটার পিছু ছাড়ল না। কারণ ঠিক ২ মাস পর জারিফ কৃষি ব্যাংকে জয়েন আবার খুলনা চলে গেল। তাঁর পোস্টিং খুলনার প্রত্যন্ত অঞ্চল বটিয়াঘাটায়।
সে শহরে বাসা নিয়েছে। রোজ সে সিএনজিতে করে বটিয়াঘাটা আসা-যাওয়া করে।
এই সময় আমি ১৫ দিনের জন্য খুলনা গেলাম। কোনো কাজে না, এদিক-ওদিক ঘুরব, ছবি তুলব— এই টুকুই। আমি উঠলাম চাচার বাসায়, দৌলতপুরে। প্রতি সন্ধ্যায় আমি খুলনা শহরে যাই। জারিফের সাথে দেখা হয়। একদিন সে জোর করে আমাকে তাঁর বাসায় রেখে দিল।
সেদিন খুলনায় চমৎকার বৃষ্টি নেমেছে। জারিফের জুনিয়র ফরহাদ বাসা থেকে গরুর মাংস রান্না করে নিয়ে এসেছে। ভাত-গরুর মাংস খাওয়া হবে।
আমি জারিফের বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছি। দেখি, জারিফ বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে বাসার দিকে আসছে। এই ছেলে এই বৃষ্টিতে বাইরে গেছে কেন?
বোকাচোদাটা ভিজে জুবুথুবু হয়ে ঘরে ঢুকেছে। হাতে একটা পাউরুটির প্যাকেট। ‘জোবায়ের পাউরুটি’।
বহু বছর আগে কুষ্টিয়ায় লালন সাঁইয়ের মাজারে বসে আমি জারিফকে বলেছিলাম, আমার প্রিয় খাবার পাউরুটি-গরুর মাংস।
ঢাকায় ফিরে ১ মাস পর জানতে পারলাম, জারিফ জামান খুলনায় তরমুজের ব্যবসা করছে। আগের বছর তরমুজের বাম্পার ফলন হয়েছে। তাই সে এবার তরমুজে ইনভেস্ট করেছে। স্বাভাবিকভাবেই সে একা করে নাই, সাথে ৪-৫ জন ভাই-ব্রাদার নিয়ে করেছে। এবং যথারীতি হোগামারা খেয়েছে।
তরমুজ ব্যবসায় ৫ লাখ টাকা লস খেয়ে জারিফ বনানী ব্রাঞ্চে পোস্টিং নিয়ে ঢাকায় ফেরত আসলো।
কেটে গেল আরও কিছুদিন। সামনে আমার বিয়ে। জারিফ আর মুন্না হাজির। তারা আমার বিয়ে নামানোর দায়িত্ব নিয়ে নিল।
আমি দাওয়াত দেয়া শুরু করলাম। আমার নিজের গেস্টের চেয়ে বোকাচোদা জারিফের গেস্ট বেশি। আমি বিরস মুখে এঁদের দাওয়াত দিতে থাকলাম।
লজিস্টিকস জারিফ আর মুন্না দেখবে। বিয়ের দিন জারিফ, মুন্নার অফিস থেকে একটা SUV নিয়ে এসেছে। সেই কোটি টাকার গাড়িতে চড়ে আমার বাপ-মা, খালা বিয়েতে গেলেন।
বৌভাত আমাদের অনুষ্ঠান। আমাদের মানে জারিফ আর মুন্নার অনুষ্ঠান। ভেন্যু অফিসার্স ক্লাব। ভেন্যুতে একটা পুলিশের গাড়ি উপস্থিত। কারণ বিয়ের গিফট আনার জন্য একটা পিকআপ ভ্যান থাকলে ভালো হয়। আমি ভেন্যুতে পৌঁছে দেখি পুলিশ ভ্যান। আমি এদিকে এসবের কিছুই জানি না।
জারিফ আর মুন্না এসব রেডি করে স্যুট পরে খাবার গুনতে ঢুকে গেছে। কয়টা খাবার যাচ্ছে, বাইরের কেউ খাচ্ছে কি না— ৪ ঘণ্টা ধরে হেঁটে হেঁটে দুজন এসব তদারকি করছে।
আমার সাথে কে কে খাবে, তাঁর লিস্ট সকালেই আমার থেকে জারিফ এসে নিয়ে গেছে। এঁদের সবাইকে সে ৩০ মিনিট পরপর মনে করিয়ে দিচ্ছে যেন খিদা লাগলেও তারা কেউ না খেয়ে ফেলে। “ভাই আপনাদের নিয়ে একসাথে খাবে।”
আমি আমার মামা-শ্বশুরের সাথে ছবি তুলছি। দেখি, দূর থেকে জারিফ জামান দৌড়ে আসছে। আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলাম। আবার জানি কী হলো।
জারিফের চেহারায় প্রচণ্ড রাগ। সে মোবাইল বের করে একজনের ছবি দেখিয়ে বলল, “ভাই, একে চিনো? এ ২ বার খাবার খাইসে। এরে কি তাইলে সাইডে নিয়া বানাবো আমরা, ভাই?” আমি হতাশ হয়ে ওর দিকে তাকালাম। সে অত্যন্ত আগ্রহ নিয়ে আমার ডিসিশনের জন্য অপেক্ষা করছে।
বিয়ের পর আমি বাসা চেঞ্জ করে মিরপুর চলে আসলাম। জারিফের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ কমে গেল। ছেলেটা কী করে, কিছুই জানি না। সোশ্যাল মিডিয়া পার্সন জারিফ কখনোই ছিল না। ২-৩ সপ্তাহ পরপর হোয়াটসঅ্যাপে কথা হয়।
বোকাচোদা এরই মধ্যে দুই-তিনবার বিসিএস ভাইভা দিয়েছে। ভাইভা দিয়ে একদিন আমার সাথে দেখা করতে এসেছে। পায়ে দেখি নতুন এক জোড়া সুন্দর বুট জুতা। জানলাম, জুতাটা মুন্না জারিফের জন্য বাইরে থেকে নিয়ে এসেছে। বোকাচোদাটা ফরমাল পরে সাথে সেই বুট পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।
ভাইভার বিস্তারিত শুনলাম। সে আমার কাছে জানতে চায়, তাঁর ভাইভা কেমন হয়েছে বলে আমার মনে হয়।
আমি বললাম,
– ভাইভা আবার খারাপ হবে কেন?
– ভাই, আমার ভাইভা ভালো হওয়া টাফ।
– ধ্যাত, কী কস? তুই অনেক নলেজেবল। তোর অ্যাটিটিউড পছন্দ হবে এক্সামিনারদের। স্বাভাবিক।
– না ভাই, স্বাভাবিক না।
– কেন?
জারিফ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আমার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
– ভাই, আমার হাইট ৫ ফুট ২ ইঞ্চি। জুতা পরলে ৩ ইঞ্চি। আমার মাথায় চুল নাই। আমার চেহারাটাও ভালো না। তুমি এত লম্বা একটা মানুষ। তুমি যখন কোনো রুমে ঢোকো, সবাই ইমপ্রেসড হয়। তোমার ব্যাপারে একটা ভালো এক্সপ্রেশন থাকে। আমাকে কেউ খেয়াল করে না। আমার ব্যাপারে কোনো এক্সপ্রেশন তৈরি হয় না। আমারে সেটা তৈরি করতে হয়। তৈরি করতে সময় লাগে। বেশিরভাগ সময় আমি সেই সময়টা পাই নাই লাইফে।
আমি কেন জানি কিছু বলতে পারলাম না।
কিছুদিন পর মুন্নার বিয়ে। বিয়েতে আমি আর আমার স্ত্রী বিভা যাব। জারিফ তাঁর বন্ধু সুদীপ্তকে নিয়ে আমার বাসায় হাজির। সাথে সুদীপ্তর গাড়ি। জারিফের দাবি, “ভাবী যাবে আমাদের বিয়েতে, গাড়ি নিয়ে না আসলে কীভাবে হয়?”
বিয়েতে গিয়ে দেখি, মুন্নার গার্ডিয়ান জারিফের বাবা খন্দকার সাহেব। এদিকে জারিফ ব্যস্ত বিভার কোনো সমস্যা হচ্ছে কি না, সেটা নিয়ে।
বিভা আমার সাথে একটা ছবি তুলতে চাইল। বোকাচোদা জারিফ, মুন্না আর ওর বউয়ের ছবি তোলানো বন্ধ করে ফটোগ্রাফার নিয়ে চলে আসলো আমাদের ছবি তোলার জন্য। আমি আরও একবার বিরক্ত এবং হতাশ হলাম।
আওয়ামী লীগের পতনের দিন আমি ছবি তুলতে বের হয়েছি। জারিফের সাথে দেখা করলাম। ছেলেটা মানতে পারছে না, শেখ হাসিনা সবাইকে এভাবে বিপদে ফেলে একা পালিয়ে গেছেন।
রাস্তায় সবাই যখন শেখ মুজিবের ছবি পোড়াচ্ছিল, জারিফ রেগে যাচ্ছিল। একসময় সে হতাশ হয়ে বলে ফেলল, “ভাই, ভালো হইসে পালায় গেসে। মহিলা মানুষ। না পালাইলে লোকজন কী করত ঠিক নাই। এগুলা দেখলে ভুলতে পারতাম না। এমনিতেই নেতা-কর্মীদের লাইফ নষ্ট কইরা গেসে। নিজের লাইফ অন্তত ঠিক রাখুক।”
কিছুদিন পর শুনলাম, জারিফের বাপ তাঁর ছেলেকে বিয়ে দিতে চান। খন্দকার সাহেবের ধারণা, জারিফের এখনো বিয়ে হয় নি শুধুমাত্র একটি কারণে। কারণ জারিফ টাক।
উনি তার টাক ছেলে কে এখন টাকা দিতে চান। জারিফকে সেই টাকা নিয়ে হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্ট করে টাক সমস্যার সমাধান করতে হবে। শুরু হলো নতুন এক পিনিক।
টাক নিয়ে গ্যাঞ্জাম করে জারিফ বাসা থেকে বের হয়ে যায় প্রায়। উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের মধ্যে সে আংকেলকে ডায়লগ দিয়ে দিল, “যে মেয়ের আমার চুল নিয়ে সমস্যা, তাঁকে আমার দরকার নাই।”
জারিফের ফুপু থেকে ভাবিরা জারিফকে ফোন দেয়া শুরু করল। সবাই জারিফকে হেয়ার ট্রান্সপ্লান্ট সেন্টারের খোঁজ দেন। আংকেল এদের কল দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন তার বোকাচোদা টাক ছেলেকে চুল গজানোর ট্রিটমেন্ট করাতে রাজি করানোর।
বিয়ে নিয়ে নানা পিনিকের শেষ লগ্নে অবশ্য জারিফের বিয়ে হয়ে গেল। এই তো মাত্র ৮ মাস আগের কথা। আমি অত্যন্ত বিরক্ত হলাম। যাক বোকাচোদা এবার কম বিরক্ত করবে।
জারিফের বিয়েতে গেলাম। আমার স্ত্রী তখন ৩১ সপ্তাহের প্রেগন্যান্ট। তাকে ছাড়াই যেতে হল। এই প্রথম জারিফকে দেখলাম আমার ওপর রাগ করতে। তার ভাবী কে কেন নিয়ে যাই নাই?
বোকাচোদাকে আমি কোনভাবেই বোঝাতে পারলাম না যে একজন প্রেগন্যান্ট মেয়ের পক্ষে এই সময় চলাফেরা করা মুশকিল। আমি একটা পর্যায়ে হাল ছেড়ে দিলাম।
জারিফের বিয়ের ২ মাস পর আমার একটা ছেলে হলো। বিভা আর আমি কয়েকবার আলাপ করলাম, জারিফ আর ওর বউকে বাসায় দাওয়াত দিতে হবে। একটা জামদানি শাড়ি কিনতে হবে ওর বউয়ের জন্য। কিন্তু এই অবস্থায় তো দাওয়াত দেয়া যায় না। বাচ্চা অনেক ছোট। কোরবানির ঈদের পর একদিন ওদের বাসায় ডাকতে হবে।
এর মধ্যে গত বছর আমি একটা গাড়ি কিনেছি। জারিফকে ইচ্ছা করে জানাই নি। খুলনা থাকতে জারিফ আর আমার প্ল্যান ছিল, একদিন একটা গাড়ি নিয়ে পুরো খুলনা ঘুরব।
আমার প্ল্যান হচ্ছে, একটা বন্ধ দেখে ওকে বলব, “চল খুলনা যাই।” এরপর বাস টার্মিনালে গাড়ি নিয়ে এসে ওকে গাড়িতে তুলে খুলনা চলে যাব।
গত মাসে একদিন জারিফ আমার সাথে দেখা করতে গুলশান আসলো। দুপুরে একসাথে লাঞ্চ করলাম। এই বোকাচোদার মাথায় এখন নতুন ভূত ভর করেছে। সে ব্যবসা করবে। তরমুজের লস খেয়েও এই ছেলের শিক্ষা হয় নাই। আমি আবার বিরক্ত হলাম।
যাওয়ার আগে বলল,
– ভাই, ভাতিজাকে তো দেখলাম না। একদিন আমাদের সময় দাও না। বউরে নিয়া আসি।
– তোর ভাবী একটু সুস্থ হোক। আয়োজনের ব্যাপার আছে একটা।
– কী ভাই আয়োজন। সুলতানস থেকে কাচ্চি অর্ডার করে দিলেই তো হয়।
– বোকাচোদা, তুমি একা আসলে বরবটি ভাজি দিয়েও খাওয়ানো যায়। তোমার বউকে এভাবে ডাকা যায় না। তোমার বউকে দাওয়াত দিয়ে কাচ্চি অর্ডার করে খাওয়ালে, তোমার ভাবী আমাকে বাসা থেকে বের করে দিবে।
– আচ্ছা ভাই, যা ভালো বুঝো। তাড়াতাড়ি ডাকো। ভাতিজার সাথে ভাও করা দরকার। আমাদের লাইনে আনতে হবে ওরে।
আর বেশিক্ষণ থাকলে বিরক্ত করা শুরু করবে। আমি ডিসিসি মার্কেট থেকে ওকে একটা ভেপ কিনে দিয়ে বাসায় পাঠায় দিলাম।
গত সপ্তাহের বুধবার সে আবার দেখা করতে চাইল। নিশ্চয়ই বোকাচোদা আবার ব্যবসা নিয়ে আলাপ করবে। কপাল ভালো, ঐদিন আমি ছুটিতে ছিলাম। বেচারা মন খারাপ করে ফোন রেখে দিল। দেখা হলো না।
২ দিন পর শুক্রবার দুপুর ২টায় জারিফ মারা গেল।
এই বোকাচোদা এক দিনে ৩টা হার্ট অ্যাটাক করে মরে গেল!
আপনি চিন্তা করতে পারেন, একটা ছেলে কতটা বোকাচোদা হলে একদিনে তিনবার হার্ট অ্যাটাক করে?
বোকাচোদাটা আমার ছেলেটাকে না দেখেই চলে গেল। আমার গাড়ি কেনার খবরটাও পাইল না। আমাকে কী এক মহা বিপদে ফেলে চলে গেল, চিন্তা করে দেখেন! আমি এখন আমার ছেলেকে বোঝাবো কীভাবে যে, মানুষের মন কত বড় হয়?
গেলাম বোকাচোদাটাকে দেখতে। একটা লাশের গাড়ি। সেটার ভেতরে বোকাচোদাটা শুয়ে আছে। গাড়ির আবার দেখি সুন্দর সিস্টেম। ভেতরে ঢোকা লাগে না। গ্লাসের একটা জানালা আছে। সেখান দিয়েই দেখা যায়।
সেই জানালা দিয়েই দেখলাম, আমার প্রচণ্ড আদরের ছোট ভাইটা ঘুমিয়ে আছে।
এই বোকাচোদা, কে বলেছে তোর চেহারা ভালো না? কী সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে!
দেখে মনে হচ্ছে, বোকাচোদাটা গোসল করে মুখে ক্রিম মেখে ঘুমিয়ে আছে। একটু পর উঠে বলবে,
“ভাই, আমার ২০ টাকা।”