Sharif Hassan Writes

Sharif Hassan Writes Random Thoughts

31/05/2026

দমদম রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে ঢুকে বসে আছি। জুতার তলায় কাচের গুঁড়ো মচমচ করছে। চারিদিকে ধ্বংসের চিহ্ন—একটা সাইক্লোন যেন একাট্টা হয়ে শুধু দোকানপাট গুলোর ওপর দিয়েই গিয়েছে।

ইট-পাথরের স্তূপ, টিনের তালি দেয়া তক্তার ভীড়, ছেঁড়া ত্রিপল হাওয়ায় উড়ছে আর নামছে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, এই সর্বনাশের মধ্যেও কিছু মানুষের মুখে চাপা হাসি লেগে আছে। ফিকফিক করে হাসছে সবাই যেন দারুণ কোনো মজার ব্যাপার ঘটে গেছে। ব্যাপারটা কী, বুঝতে একটু সময় লাগল।

সেই সাত সকাল বেলায় শিয়ালদা থেকে ট্রেন ধরে দমদম নেমেছি। উদ্দেশ্য একটাই—ইতিহাস বিখ্যাত চা খাওয়া। কলকাতায় বেড়াতে এসে বন্ধু ইন্দ্রজিত বলেছিল, “দমদম স্টেশনে একটা চায়ের দোকান আছে, কেবল চা না, তুই দেখবি একশো বছর আগের বিজ্ঞাপন।” শুনেই টিকিট কেটে বসে পড়লাম লোকাল ট্রেনে।

স্টেশনে নেমেই চক্ষু চড়কগাছ। প্ল্যাটফর্মের প্রায় সব দোকান গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। একেবারে কিছুই বাদ রাখে নাই। যে যার জিনিসপাতি সরাচ্ছে, কেউ ভাঙা শোকেসের সামনে দাঁড়িয়ে মাথা চুলকাচ্ছে, কেউ বা জোড়াতালি দিয়ে বেঞ্চ বানানোর চেষ্টা করছে।

পাশে দাঁড়ানো এক চা-দোকানের মালিক বললেন, কাল রাতে ‘তাণ্ডব’ বয়ে গিয়েছে। কী তাণ্ডব? শুনলাম পুরো ব্যাপারটা। ব্যাকগ্রাউন্ড না জানলে মজাটা বোঝা যাবে না, তাই আগে সেটাই বলে নেই।

গত কয়েক বছর ধরে দমদম স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে দোকানপাট এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে ট্রেন আসার সময় হাঁটার জায়গা পাওয়া যেতো না। ফুল, ফল, চা, সিঙাড়া, জুতার ফিতা, মোবাইল রিচার্জ—সব মিলিয়ে এক বিশৃঙ্খল ইকোসিস্টেম।

রেলওয়ে বারবার বলে আসছিল, বেআইনি দখল করা দোকান সব ভাঙা হবে। কিন্তু স্থানীয় নেতা থেকে শুরু করে প্ল্যাটফর্মের কুকুরটা পর্যন্ত কেউ তাদের কথা কানে তুলেনি।

শেষমেশ গত সপ্তাহে রেলওয়ে বোর্ড থেকে কড়া নির্দেশ এল, যে করেই হোক প্ল্যাটফর্ম ক্লিয়ার করতে হবে, নাহলে কর্মকর্তা সবার কপালে শনি আছে।

কাল রাতে হঠাৎ করেই ভয়ংকর এক অভিযান শুরু হলো। পুলিশ, রেলওয়ে, শ্রমিক বাহিনী—যেন যুদ্ধ ঘোষণা করে দিল। অনেক দোকানদার আগে থেকে খবর পেয়ে মালপত্র সরিয়ে নিয়েছিল।

যারা পায়নি, তাদের কপালে জুটেছে ইট আর পাথর। কিন্তু এই তাণ্ডব চলাকালীন সময়ে নাকি আচমকা একটা ফোন কল এসেছিল।

জানা যায়, কলকাতার এক হেরিটেজ-পাগল কর্মকর্তা নাকি খবর পেয়ে রেলওয়ের বড় কর্তাকে ফোন করে বলেছিলেন, “স্যার, দমদমের দুই আর তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝখানে যে চায়ের দোকানটা আছে, ওটার ভেতরে ইংরেজ আমলের চায়ের বিজ্ঞাপন লাগানো আছে। ওটা একদম ছোঁবেন না, ঐতিহাসিক জিনিস।”

কর্তা একটু থতমত খেয়ে নির্দেশ দিলেন, ওই নির্দিষ্ট দোকানটা বাদ দিয়ে বাকি সব গুঁড়িয়ে দিতে। এই কারণেই স্টেশনের বাকি দোকান ভ্যানিশ, আর ওই একমাত্র দোকানটা অক্ষত।

ব্যাস, এই খবরটা জানাজানি হতেই সকালবেলা লোকজনের মুখে চাপা হাসি ফুটেছে। বোঝেন নীতি—কুমিরের পেটে হাতি, নখের ডগায় রেহাই। ধ্বংসের মহড়ায় ছাড়পত্র পেয়েছে স্রেফ কয়েকটা ফ্রেমবন্দি কাগজ।

আমিও সেই বিশেষ চায়ের দোকানে বসব বলেই কষ্ট করে এতদূর এসেছি। এই দোকানটি ঠিক দুই ও তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের মাঝ বরাবর অবস্থিত।

প্ল্যাটফর্মের মেঝেতে এখনো ভেকু মেশিনের দাঁতের দাগ তাজা। কিন্তু ওই দোকানের কাঠের কাঠামোটা কীভাবে যেন টিকে আছে, যেন ঝড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক সাহসী বুড়ো।

দোকানের নাম বলে তেমন কিছু নেই, অনেকের কাছে ‘সি দে-র চায়ের দোকান’ নামেই পরিচিত। গবেষক দেবদত্ত গুপ্ত লিখেছিলেন—‘রেলের ইংরেজ আমলের ক্যাটারিং কন্ট্রাক্টর এইচ সি দে দমদমের এই দোকানটি চালাতেন। তিনি বিনিপয়সায় চা-ও দিতেন রেলযাত্রীদের। তাঁর সময় থেকেই বিজ্ঞাপনগুলি রয়ে গিয়েছে এখানে।’

কথাটা পড়েই আমার ভেতরকার ইতিহাস-পোকা নড়েচড়ে বসেছিল। ভাবলাম, বিনা পয়সায় চা খাওয়ানোর যে সংস্কৃতি, সেটাও তো চমৎকার।

এইচ সি দে বাবু বোধহয় মানবতায় বিশ্বাস করতেন, কিংবা মার্কেটিং কায়দায় ফ্রি চা খাইয়ে ব্র্যান্ড বানাতেন—যা-ই হোক, আমার শ্রদ্ধা জানাইতে তো আপত্তি নাই।

এতক্ষণ ধ্বংসস্তূপ পেরিয়ে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম। বুকের ভেতর উৎকণ্ঠাটা দলা পাকিয়ে ছিল। দোকানের ভেতরের দেয়ালে সেই চারটি প্রাচীন বিজ্ঞাপন টাঙানো আছে কিনা, সেটাই দেখার বিষয়।

রাতের তাণ্ডবে যদি গায়েব হয়ে যায়! দোকান তো টিকে গেল, কিন্তু বিজ্ঞাপনগুলো যদি কেউ ছিঁড়ে ফেলে থাকে, তাহলে আমার এতদূর আসা একেবারে মাটি।

দোকানের ভেতরে একটু ঠাহর করে দেখি—পিছনের কাঠের দেয়ালে সারিবদ্ধভাবে চারটি বিজ্ঞাপন ঠিক আগের মতোই টাঙানো আছে। চারদিকের ধ্বংসলীলার মাঝে এই সামান্য অক্ষত অবস্থাটুকু দেখে কেমন যেন নিশ্চিন্ত অনুভূতি হলো।

বিজ্ঞাপন চারটার দিকে তাকিয়ে মনে হলো, আমি সময়ের ভেতর দিয়ে হাঁটছি।

প্রথমটার শিরোনাম, ‘চা পানের উপকারিতা’। নিচে একেবারে ঊনিশ শতকী বাংলায় লেখা, চা কীভাবে হজমশক্তি বাড়ায়, শরীর সতেজ রাখে আর বাঙালির মেজাজ চাঙ্গা করে—একেবারে বুলেট পয়েন্ট। যেন আজকের দিনের হোয়াটসঅ্যাপ ফরোয়ার্ডের পূর্বপুরুষ।

দ্বিতীয়টা, ‘চা প্রস্তুত করিবার প্রণালী’, তাতে চা বানানোর স্টেপ-বাই-স্টেপ গাইড, পাত্র ধোয়া থেকে শুরু করে দুধের পরিমাণ—সবিস্তারে বর্ণনা করা।

তৃতীয়টিতে লেখা, ‘গরম চা: যাহাতে নাহিক মাদকতা দোষ / কিন্তু পানে করে চিত্ত পরিতোষ।’ কী দারুণ ছন্দ! চায়ের কোনো মাদকতা নেই, অথচ মনকে পরিতৃপ্ত করে—এই সরল অথচ জোরালো বার্তা। (ক্যাফেইনের ব্যাপারটা তখন ওভাবে কেউ জানতো না আর কি!)

চতুর্থ বিজ্ঞাপনটিতে সম্ভবত চায়ের দাম আর পাওয়ার ঠিকানা দেওয়া ছিল, ধুলো জমে কিছু অংশ ঝাপসা হয়ে গেছে।

আমি দোকানের বেঞ্চে বসে ভাবছি, এই যে গরম চা খেতে খেতে একশো বছর আগের বাঙালি যাত্রীরাও দাঁড়িয়ে থাকতেন, তারা কি কখনো ভেবেছিলেন তাঁদের বিজ্ঞাপন একদিন বাংলাদেশ থেকে আসা এক টুরিস্টের মন ভালো করে দেবে?

ইতিহাস যে কত অদ্ভুত জিনিস। বিজ্ঞাপনগুলো তো আসলে ভারতবর্ষে চা জনপ্রিয় করার এক বিশাল কৌশলের অংশ। চিন থেকে চা এনে প্রথমে সাহেবরাই খেতেন, পরে বাঙালির রক্তে চা মেশাতে শুরু হয় উনিশ শতকের শেষভাগে।

রেলস্টেশন ছিল সেই ক্যাম্পেইনের জমজমাট ময়দান। দমদমের এই বিজ্ঞাপনগুলো সেই চা-বিপ্লবের নীরব সৈনিক।

আমি এক কাপ চা অর্ডার করলাম। দোকানের বর্তমান মালিক, ছোটখাটো এক মাঝবয়সি লোক, হাসিমুখে চা বানালেন।

কাপে চুমুক দিয়ে মনে হলো, ইতিহাস পান করছি। মিষ্টি ঠিকঠাক, লিকারও দারুণ। ফ্রি তে না পেলেও দাম এতটাই সামান্য যে বুঝলাম, এইচ সি দে-র উত্তরসূরিরা এখনো রবিনহুডগিরি ভোলেননি।

দোকানের ভাঙাচোরা প্ল্যাটফর্মের দিকে তাকিয়ে লোকটাকে জিজ্ঞাসা করলাম, রাতে ভয় পাননি?

প্রশ্ন শুনে তাঁর মুখেও সেই একই চাপা হাসি। ব্যাপারটা পরিষ্কার, উনার দোকান বেঁচে গেছে কেবল দেয়ালে টাঙানো ওই চারটি কাগজের কল্যাণে। এই জিনিসই তাঁকে শিল্ড দিয়েছে ভেকুর হাত থেকে।

ভাবতে খারাপ লাগছে, একই রাতে কেউ হারিয়েছে তার দশ বছরের রোজগারের ঠিকানা, আর কেউ বেঁচে গেছে শুধুমাত্র চারটি অ্যান্টিক পোস্টারের সুবাদে। পৃথিবীটা বড় অদ্ভুত আর অবিচারে ভরা।

কিন্তু এই বেঁচে থাকাটা নিজের ভেতর এক অদ্ভুত আশার জন্ম দেয়। ধ্বংস যখন চারপাশে তাণ্ডব চালায়, তখনো কিছু ইতিহাস নিজের জোরে টিকে যায়। আর সেই ইতিহাস টিকে থাকলে সাধারণ মানুষের স্বপ্নগুলোও বেঁচে যায়!

চা শেষ করে দোকানের সামনে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। মোবাইলে ছবি তুললাম, পিছনদিকে সারিবদ্ধভাবে চারটি বিজ্ঞাপন ফ্রেমবন্দি হলো।

ঢাকায় ফিরে গিয়ে ইন্দ্রজিতকে বলব, ইতিহাস বাঁচাতে এক কাপ চা-ই যথেষ্ট, কিন্তু তার জন্য দরকার সাহসী বিজ্ঞাপন আর সাহস করে ফোন দেয়ার মতো একজন ইতিহাসপ্রেমী কর্মকর্তা।

স্টেশনের স্পিকারে ঘোষণা হলো, ব্যান্ডেল লোকাল আসছে।

ছুটতে ছুটতে ভাবলাম, দমদম জংশনের ধ্বংসলীলার মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এই চা-দোকানটা আসলে একটা টাইমলেস মিউজিয়াম, যা কিনা বুলডোজারের সামনে দাঁড়িয়েও নিজের মাথা নত করে নাই।

30/05/2026

দ্বিতীয় পর্ব: স্ফিংক্সের নীরবতা

২০০৩ সালের ডিসেম্বরের শেষ দিক, দিনাজপুরে তখন জাঁকিয়ে শীত পড়েছে। সকালবেলা কুয়াশা এত ঘন হয় যে রাস্তার ওপাশের মানুষটাকে দেখে মনে হয় সে এই পৃথিবীর কেউ না, বরং অন্য কোনো মাত্রা থেকে ভুল করে এই মাত্রায় হেঁটে এসেছে, আর এখন ফেরার পথ খুঁজে পাচ্ছে না।

আলুর মৌসুম চলছে পুরোদমে। রাশেদ সাহেবদের কোল্ড স্টোরেজ ভর্তি হয়ে গেছে আলু দিয়ে৷ ম্যানেজার প্রতিদিন ফোন করে হিসাব দেয় আর তিনি ফোন কানে ধরে শোনেন, কিন্তু অঙ্কগুলোর ভিতর দিয়ে তাঁর মন হেঁটে বেড়ায় অন্য কোথাও।

লাভ হচ্ছে, ভালোই হচ্ছে, কিন্তু এই লাভের খবরটা তাঁর বুকের ভিতর কোনো সুখের অনুভূতি জাগাতে পারছে না।

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি একটা জিনিস লক্ষ্য করেছেন—টাকা এবং সুখের মধ্যে যে দূরত্ব, সেটা আসলে দূরত্ব না, এটা দুইটা সম্পূর্ণ আলাদা গ্রহ, যাদের মাধ্যাকর্ষণ কখনো মেলেনি, ভবিষ্যতেও মিলবে না।

সেদিন সন্ধ্যায় তিনি বসেছিলেন বাড়ির ছাদে, হাতে এক কাপ গরম চা, আর চোখে দূরের কুয়াশায় ঢাকা পেয়ারা গাছটা, যে গাছটা প্রায় পঁচিশ বছর আগে তাঁর বাবা লাগিয়েছিলেন, এখনো ফল দেয়, কিন্তু মানুষটা আর নেই।

এই গাছটাকে কেটে ফেলার কথা ভেবেছিলেন তিনি অনেকবার, কিন্তু পারেননি, কারণ কিছু জিনিস কেটে ফেলা যায় না, শুধু দেখে যাওয়া যায়, আর ভাবা যায় কেন যে এমন হলো।

স্কটল্যান্ড থেকে ফেরার পর শাহীন তালুকদার এক অদ্ভুত পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে গেছে। সে এখন রীতিমতো রহস্যবিশেষজ্ঞ। অন্তত নিজের চোখে সে তাই।

শাহীন অন্তত পঁচিশ জনকে আইলিন মোর বাতিঘরের গল্প শুনিয়েছে। প্রতিবার গল্পের নতুন সংস্করণ বের হয়েছে।

একবার বলেছে তিনজন বাতিঘর গার্ডকে সমুদ্রের দৈত্য তুলে নিয়ে গেছে। আরেকবার বলেছে ব্রিটিশ সরকার আসল সত্যিটা লুকিয়েছে। তৃতীয়বার বলেছে, “আমার নিজেরও সন্দেহ হয়েছিল, কিন্তু আমি বিষয়টা আর খুঁচাই নাই।”

যে মানুষ বাতিঘরের ভেতরে ঢুকে একটা বিড়াল দেখে প্রায় অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিল, সে এখন বড়াই করে বেড়ায়।

রাশেদ যখন এগুলো শোনেন, কিছু বলেন না, শুধু মুচকি হাসেন। তিনি জানেন, মানুষ তার গল্প নিয়ে বাঁচে, গল্প ছাড়া মানুষের বেঁচে থাকাটা নিতান্তই জৈবিক একটা প্রক্রিয়া মাত্র, যার কোনো মানে হয় না।

এদিকে রাফি আইইউটি থেকে সেমিস্টার ফাইনাল দিয়ে ফিরেছে। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে গত এক মাসে সে সূর্যের আলো দেখেনি, শুধু বই, ল্যাপটপ, আর ফ্লুরোসেন্ট বাতির নিচে অঙ্ক কষেছে।

রাশেদ ওকে জিজ্ঞেস করলেন, “পরীক্ষা কেমন হয়েছে রে ব্যাটা?”

রাফি ছোট্ট করে উত্তর দিল, “ভালো।”

“কত ভালো?”

“এ প্লাস আসার মতো।”

শাহীন পাশে বসে চায়ে চুমুক দিচ্ছিল, বলল, “এই পোলার একটা সমস্যা আছে। আশি পাইলেও মুখ কালা করে বইসা থাকে। এইরকম পোলা বড় হয়ে কী করব, আল্লাহই জানে।”

রাফি গম্ভীর গলায় বলল, “ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে অনেক কম্পিটিশন, চাচা।”

শাহীন মুখ টিপে হেসে বলল, “জীবনেও কম্পিটিশন আছে, বাপ। সেখানে সিজিপিএ লাগে না, লাগে কাণ্ডজ্ঞান। তোর কাণ্ডজ্ঞানের সিজিপিএ কত?”

রাফি জবাব দিল না, শুধু দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তার চাচার সঙ্গে তর্ক করা মানে ইটের দেয়ালে মাথা ঠোকা, কারণ শাহীন কোনো যুক্তি দিয়ে কথা বলে না, অভিজ্ঞতা দিয়ে কথা বলে, আর অভিজ্ঞতা যুক্তির চেয়ে অনেক বেশি নিষ্ঠুর, কিন্তু অনেক বেশি সৎ।

ওদের এবারের গন্তব্য মিশর। বরাবরের মতোই রাশেদের আগ্রহ কিন্তু ফারাওদের অভিশাপ বা পিরামিডের গোপন কুঠুরি নিয়ে না। তাঁর আগ্রহ স্ফিংক্সকে নিয়ে।

সেই মহান মূর্তি, Great Sphinx of Giza, যে কিনা গিজার মরুভূমিতে হাজার হাজার বছর ধরে বসে আছে, আর কিছুই বলে না।

পিরামিড যেন ধনী মানুষের বাড়ি, যেখানে লাশ ঘুমিয়ে আছে সোনার কফিনে, আর স্ফিংক্স যেন সেই বাড়ির সামনে বসে থাকা এক নীরব বৃদ্ধ, যে সব জানে, সব দেখেছে, কিন্তু মুখ খোলে না।

রাশেদ এই ধরনের রহস্যই পছন্দ করেন, যেখানে চিৎকার নেই, আছে কেবল দীর্ঘ, গাঢ় নীরবতা। তিনি শাহীনকে বললেন, “মিশর যাবি না?”

শাহীন বলল, “মিশর? আরে ভাই, ওইখানে নাকি ফারাওয়ের অভিশাপ আছে, সমাধির ভেতর ঢুকলেই নাকি সবাই মারা যায়। আমি মরতে রাজি না।”

রাফি বলল, “চাচা, ফারাওয়ের অভিশাপ বলতে যা বোঝায়, সেটা আসলে টক্সিক ছত্রাকের স্পোর, যা সমাধির ভিতর জমা থাকে। এতে শ্বাসকষ্ট হয়ে মৃত্যু হতে পারে। এটা কোনো অভিশাপ না, সায়েন্টিফিক্যালি এক্সপ্লেইনেবল।”

শাহীন জ্বালাময়ী চোখে তাকিয়ে বলল, “তুই আমারে টক্সিক ছাতার স্পোর খাওয়াইতে চাস? তোর চাচিরে জিজ্ঞেস কর, তুই ছোটবেলায় কেমন ছিলি। একটা হিসাবের খাতা বগের তলে লইয়া ঘুমাইতে যাইতি, এখনো তাই করিস।”

রাশেদ হেসে ফেললেন, কিন্তু মনে মনে ভাবলেন, এই দুইজনকে ছাড়া কোনো ভ্রমণই সম্পূর্ণ হয় না।

কায়রোতে পৌঁছানোর পর শাহীনের প্রথম প্রতিক্রিয়া ছিল একেবারে বিশুদ্ধ পর্যবেক্ষণে ভরা। সে বলল, “এই শহরটা ঢাকার চাচাতো ভাই। ট্রাফিক আছে, হর্ন আছে, ধুলা আছে, মানুষজন আছে, আর রাস্তায় দাঁড়াইলে মনে হয় কেউ না কেউ ঠিকই ধাক্কা দিব। কিন্তু কায়রোতে উট দেখা যায়, ঢাকায় দেখা যায় না, এইডা একটা বড় পার্থক্য।”

কথাটা পুরোপুরি মিথ্যা না, কিন্তু পুরোপুরি সত্যিও না। তবে রাফি জানালার বাইরে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল, “কিন্তু এদের ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং আমাদের চেয়ে ভালো, ভলিউম বেশি কিন্তু ব্লকেজ কম।”

শাহীন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “তুই বিদেশে আসলেই বাংলাদেশের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে শুরু করস, এইটা তোর বদভ্যাস।”

তারা পুরোনো কায়রোর এক ছোট্ট হোটেলে উঠল, যার মালিক ইউসুফ নামের একজন ভদ্রলোক, তার গোঁফ দেখে মনে হয় ছোটখাটো বিদ্রোহ দমন করতে পারেন, কিন্তু হাসিটা অদ্ভুত রকমের আন্তরিক।

রাশেদ এটাসেটা কথার পরে তাকে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি স্ফিংক্সের ব্যাপারে কি জানেন? কোনো ধরনের রহস্যে বিশ্বাস করেন?”

ইউসুফ তামাক-গন্ধা গলায় উত্তর দিল, “আমি ব্যবসা করি, স্যার। যে মানুষ ব্যবসা করে, সে কোনো রহস্যে বিশ্বাস করে না।”

“তাহলে কী বিশ্বাস করেন?”

“কাস্টমারের দ্রুত বিল পে করার ক্ষমতায়।”

রাশেদ সঙ্গে সঙ্গে লোকটাকে পছন্দ করে ফেললেন, কারণ যে মানুষ সত্যটা এত সহজে স্বীকারোক্তি দিতে পারে, তার ভিতর নিশ্চয়ই কোনো গভীর দর্শন লুকিয়ে আছে, অথবা সে মনেপ্রাণে বিশ্বাস করে যে জীবনে কোনো দর্শনেরই প্রয়োজন নেই, যেটা আরও বড় দর্শন।

পরদিন ভোরে তারা গিজায় গেল। শীতের সকাল, মরুভূমির বাতাস যেন শুষে নিচ্ছে শরীরের সব আর্দ্রতা, দূরে পিরামিডের ত্রিভুজ আকাশের নীলকে ফ্রেম করে রেখেছে, আর তার সামনে স্ফিংক্স বসে আছে হাজার হাজার বছরের ক্লান্তি নিয়ে।

প্রথম দেখায় রাশেদের মনে হলো, ছবিতে এই বিস্ময়ের অর্ধেক সৌন্দর্যও ধরা যায় না। বিশাল পাথরের শরীর, সিংহের দেহ, আর মানুষের মুখ—যে মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয় এ যেন পৃথিবীর সমস্ত মূর্খতা, সমস্ত যুদ্ধ, সমস্ত ভালোবাসা আর সমস্ত হারিয়ে যাওয়া দেখে ফেলেছে, তবু কিছু বলছে না, কারণ বলার কিছু নেই, অথবা বললেও কেউ বুঝবে না।

রাফি ওর সাথে থাকা ক্যামেরা বের করে ছবি তুলতে লাগল, তারপর স্ফিংক্সের শরীরের ক্ষয়চিহ্নগুলোর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, “এই ক্ষয়চিহ্নগুলো অদ্ভুত।”

“কেন?”

“বাতাসে এমন ক্ষয় হওয়ার কথা না।”

“তুই পাঁচ মিনিটের মধ্যে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত মূর্তির রোগ নির্ণয় শুরু করে দিলি?”

“ডেটা ইজ ডেটা, মামা।”

তাদের গাইড মুস্তাফা, মধ্যবয়সী মানুষ, চোখে এক অদ্ভুত ঝিলিক আর গল্প বলার ভঙ্গিতে এক ধরনের মাদকতা আছে। সে বলল, “আপনারা কি জানেন, স্ফিংক্সের সবচেয়ে বড় রহস্য কী?”

রাফি তক্ষুনি বলল, “এটার নাক কে ভেঙেছে? নেপোলিয়নের কামানের গোলা নাকি?”

মুস্তাফা মাথা নাড়ল, “না, ওটা মিথ। নাক ভাঙার আগের ছবিও আছে, যেখানে নাক অক্ষত ছিল, অথচ নেপোলিয়নের জন্মও তখন হয়নি। আসলে এর নাক টা ভাঙেন এক সুফি সাধক, ত্রয়োদশ শতকে, মানুষ যখন মূর্তিকে দেবতা ভেবে পূজা করত, তখন তিনি রাগ করে ভেঙে দেন।”

রাফি চুপ, তার ইতিহাসের জ্ঞানটা একটু নড়বড়ে হলো। মুস্তাফা বলল, “স্ফিংক্সের সবচেয়ে বড় রহস্য হলো—সে কেন চুপ!”

রাফি হতভম্ব হয়ে বলল, “মানে?” মুস্তাফা স্ফিংক্সের দিকে তাকিয়ে বলল, “পিরামিড বলে দেয় কার সমাধি। মন্দির বলে দেয় কোন দেবতার জন্য বানানো। রাজপ্রাসাদ বলে দেয় কে রাজা ছিল। কিন্তু স্ফিংক্স কিছুই বলে না। না কোন শিলালিপি, না কোন চিহ্ন, না কোন নাম। সে শুধু বসে আছে, আর তাকিয়ে দেখছে।”

রাশেদ চুপচাপ শুনছিলেন, কথাটা তার ভিতর গেঁথে গেল, কারণ তিনিও তো তাকিয়ে আছেন, কোনো উত্তর না পেয়েই।

সেদিন সন্ধ্যায় মুস্তাফা তাদের নিয়ে গেল এক বৃদ্ধ প্রত্নতত্ত্ববিদ ডক্টর হাসানের বাড়িতে, কায়রোর উপকণ্ঠে। লোকটার বয়স আশির কাছাকাছি, ঘরভর্তি বই, ধুলো, পাথরের কিছু রেপ্লিকা, আর চার-পাঁচটা বিড়াল, যারা এমনভাবে বসে আছে যেন তারাই বাড়ির আসল মালিক।

ডক্টর হাসান চা খেতে খেতে বললেন, “মানুষ শুধু ভুলভাল প্রশ্ন করে।”

রাফি তক্ষুনি জিজ্ঞেস করল, “কোন প্রশ্ন?”

“স্ফিংক্স কত পুরোনো? এটা একটা ভুল প্রশ্ন। আসল প্রশ্ন হওয়া উচিত—আমরা কেন তার বয়স নিয়ে নিশ্চিত নই?”

ঘরে নীরবতা নেমে এলো। তিনি মানচিত্র আর ছবি বের করলেন, স্ফিংক্সের শরীরে বৃষ্টির ক্ষয়ের মতো দাগ, অথচ মিশরে গত পাঁচ হাজার বছর ধরে তেমন বৃষ্টি হয়নি, তার মানে এই পাথর তার চেয়েও পুরোনো, হয়তো দশ-বারো হাজার বছর আগের, হয়তো এমন কোনো সভ্যতার সময়কার, যার নামও আমরা জানি না।

রাফি সঙ্গে সঙ্গে বিতর্ক শুরু করল, “এভিডেন্স য বললেন, সব ইনসাফিশিয়েন্ট। আর ডেটা-ও ইনকমপ্লিট। এভাবে তো কনক্লুশন ড্র করা যায় না।”

বৃদ্ধ হেসে ফেললেন, বললেন, “তুমি ইঞ্জিনিয়ার তো?”

“জি।”

“বুঝতে পারছি। তুমি উত্তর খুঁজছ, কিন্তু আমি প্রশ্ন খুঁজছি।”

রাফি চুপ, তার মুখ দেখে মনে হলো এই প্রথম কেউ তাকে এমন কিছু বলেছে যার কোনো পাল্টা যুক্তি তার কাছে নেই।

রাশেদ মনে মনে আনন্দ পেলেন, কখনও কখনও মেধাবী এইসব ইয়াং ছেলেপুলেদের একটু আধটু বিভ্রান্ত হওয়ার দরকার আছে, নইলে তারা ভাবে পৃথিবীটা ক্যালকুলাসের একটা এক্সটেনশন মাত্র- আর কিছুই নয়।

সেই রাতে রাশেদ ঘুমাতে পারছিলেন না। রুমের দরজা খুলে হোটেলের ছাদে উঠে গেলেন, দূরে গিজার আলো জ্বলছে, মরুভূমির অন্ধকার যেন পৃথিবীর সব নিভে যাওয়া প্রশ্নকে বুকে চেপে ধরে আছে, শীতল বাতাস কানে কেমন একটা একটানা সুর শোনাচ্ছে।

কিছুক্ষণ পরে দেখলেন রাফিও চলে এসেছে, নিঃশব্দে তার পাশে বসেছে। দুজন অনেকক্ষণ চুপচাপ বসে থাকলেন, শুধু দূরের শহরের আওয়াজ ভেসে আসছে।

তারপর রাফি বলল, “মামা, আপনি কেন এসব জায়গায় আসেন? যেখানে উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না?”

রাশেদ কিছুক্ষণ চুপ রইলেন, তারপর বললেন, “কারণ জীবনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোরও কোনো উত্তর নাই।”

“যেমন?”

“কেন কিছু মানুষকে ভালোবেসেও ধরে রাখা যায় না।”

রাফি চুপ, দূরে তাকিয়ে রইল।

রাশেদ আবার বললেন, “আমার একসময় ধারণা ছিল, সব কিছুর ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। কেন বৃষ্টি হয়, কেন ফসল হয়, কেন মানুষ অসুখে মরে। কিন্তু কিছু প্রশ্নের উত্তর কোনোদিন পাওয়া যায় না।

আমার জীবন টা কেন এমন হলো, আমি আজও এর উত্তর জানি না। কখনো কোনো ব্যাখ্যা পাইনি। হয়তো কোনো ব্যাখ্যা আছে, কিন্তু সেটা জানার মতো জ্ঞান আমার জানা নাই।”

রাফি কোনো উত্তর দিল না, তার চুপ থাকাটাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্বীকারোক্তি। দূরে কায়রোর কোথাও আজান ভেসে এলো, সেই সুরে কেমন একটা চিরন্তন ক্লান্তি আর চিরন্তন শান্তি একসঙ্গে মেশানো, রাশেদের মনে হলো এই অদ্ভুত উপলব্ধিটাই আসলে স্ফিংক্সের কণ্ঠস্বর, যে কথা বলতে জানে, কিন্তু বলে না।

পরদিন ভোরে তারা আবার গিজায় গেল, সূর্য উঠছে আর সোনালি আলো ধীরে ধীরে স্ফিংক্সের পাথরের মুখে পড়ছে, সেই আলোতে মূর্তিটাকে অদ্ভুত জীবন্ত লাগছিল, যেন সে ঘুমাচ্ছে না, হাজার বছর ধরে অপেক্ষা করছে, কোনো এক প্রশ্নের, যে প্রশ্নটা কেউ কখনো করল না।

গাইড মুস্তাফা ধীরে ধীরে বলল, “আমার দাদা বলতেন, স্ফিংক্স মানুষের প্রশ্ন খায়। যত বেশি প্রশ্ন করবে, তত বেশি প্রশ্ন নিয়ে ফিরবে।”

ফেরার পথে শাহীন উটে চড়ার বায়না ধরল, আর উট প্রথম পাঁচ মিনিট শান্ত থেকে হঠাৎ কোনো অজানা কারণে বসে পড়ল, শাহীন প্রায় সামনের দিকে গড়িয়ে বালিতে পড়ে যাচ্ছিল, আর উটটা বিরক্ত চোখে তার দিকে তাকাল, যেন ভাবছে, “এত ওজন লইয়া আমি কেমনে হাঁটব?”

রাফি এত জোরে হাসছিল যে তার শ্বাসকষ্ট হওয়ার জোগাড়, আর শাহীন উঠে দাঁড়িয়ে ধুলা ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, “আমি নিশ্চিত, এই উট আমারে পছন্দ করে না।”

রাশেদ বললেন, “তুই নিজেও তো ওরে পছন্দ করিস না।”

“সেইটা আলাদা ব্যাপার। এই উটরে আমি সহানুভূতি দেখাইছি, অথচ সে আমারে সেটার প্রতিদান দিল না। পৃথিবীর বেশিরভাগ সম্পর্কই এইরকম।”

রাশেদ থমকে গেলেন, কারণ শাহীন না বুঝেই অনেক গভীর একটা সত্য বলে ফেলল।

ঢাকায় ফেরার প্লেনে রাশেদ তার ডায়েরিটা খুললেন, ফাউন্টেন পেনটা বের করে লিখতে শুরু করলেন— “মিশরে এসে কোনো গুপ্তকক্ষ পেলাম না, কোনো হারানো সভ্যতার নিদর্শনও আলাদাভাবে আমাকে টানলো না, কিন্তু একটা বড় শিক্ষা পেলাম।

সব রহস্য ভয়ংকর হয় না, কিছু রহস্য হয়ে থাকে শুধুই নীরব।

স্ফিংক্সের সামনে দাঁড়িয়ে মনে হয়েছিলো, পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর হয়তো কোথাও লেখা নেই, হয়তো সেগুলো শুধু প্রশ্ন হয়েই থেকে গেছে, আর মানুষ সেই প্রশ্নগুলো উত্তরাধিকার হিসেবে বহন করছে যুগ যুগ ধরে।

স্ফিংক্স পাঁচ হাজার বছর ধরে চুপ করে আছে, আমরা পাঁচ মিনিটও নীরব থাকতে পারি না, সম্ভবত এটাই তার সবচেয়ে বড় রহস্য।

আর আমার নিজের চুপ থাকাটাও কি তেমনই কিছু, নাকি শুধুই কাপুরুষতা, সে উত্তর আমি এখনো পাইনি, হয়তো পাবও না।”

ডায়েরি বন্ধ করে তিনি জানালার বাইরে তাকালেন, মেঘের নিচে পৃথিবী, আর পৃথিবীর কোথাও মরুভূমির বুকে এক পাথরের মুখ এখনো দিগন্তের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন সে সব জানে, কিন্তু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়ে আছে যে কিছু বলবে না।

ঠিক যেমন রাশেদ নিজেও জানেন অনেক কিছু, কিন্তু বলেন না, কারণ কিছু সত্য বলা যায় না, শুধু বহন করা যায়।

(চলবে — তৃতীয় পর্ব: আমেরিকার রোয়ানোক উপনিবেশের নিখোঁজ মানুষগুলো)

29/05/2026

সরকারি চাকরি থেকে অবসরের পর মানুষের সাধারণত দুইটা জিনিস হয়। কেউ শরীরে ডায়াবেটিস বাড়িয়ে ফেলে, আর কেউ ধর্মকর্ম বাড়িয়ে দেয়।

গোলাম আওরঙ্গজেব মিয়া—যার ডাকনাম রাশেদ- যিনি সরকারের একজন যুগ্মসচিব ছিলেন—তিনি এই দুইটার কোনোটাই বাড়ান নাই। বরং তিনি পৃথিবী ঘুরাঘুরি বাড়িয়েছেন।

পঞ্চাশ বছর বয়সে আর্লি রিটায়ারমেন্ট নিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে অফিসিয়ালি লিখেছিলেন—“ব্যক্তিগত কারণ”। অথচ সবাই জানত, ব্যক্তিগত কারণ বলতে তিনি বুঝিয়েছেন, “আর সহ্য হচ্ছে না।”

প্রতিদিন ফাইল। প্রতিদিন নোটশিট। প্রতিদিন কোনো এক প্রভাবশালী ফোন দিয়ে বলত, “স্যার, একটু দেখবেন।”

মানুষের আত্মাও তো একসময় ক্লান্ত হয়।

রিটায়ারমেন্টটা নিলেন এমন নিঃশব্দে, যেন মানুষটা চাকরি না, গোপন কোনো অসুখ থেকে মুক্তি নিচ্ছে।

সচিবালয়ের সহকর্মীরা অবশ্য বিদায় অনুষ্ঠান করেছিল। কেক কাটা হয়েছিল। ফুল দেওয়া হয়েছিল। একজন অতিরিক্ত সচিব আবেগভরা গলায় বলেছিলেন, “রাশেদ ভাইয়ের মতো ক্বরিতকর্মা অফিসার এই দেশে আর হবে না।”

কথাটা শুনে রাশেদের খুব হাসি পেয়েছিল।

বাংলাদেশে মানুষ সাধারণত দুই অবস্থায় সত্য কথা বলে না—বিয়ের সময় এবং বিদায়ের সময়।

যে অফিসে বাইশ বছর ধরে তাকে “অস্বস্তিকর লোক” হিসেবে দেখা হয়েছে, সেই অফিসই অবসরের দিন তাকে সততার প্রতীক বানিয়ে ফেলল!

মানুষ বিদায় নেওয়ার সময় হঠাৎ করেই কিভাবে খুব ভালো হয়ে যায়! যেন সবাই বুঝতে পারে, সামনে আর দেখা হবে না, তাই একটু মিথ্যা বলে বিদায় দেয়া যাক।

ঢাকার মোহাম্মদপুরে তার তিন রুমের একটা ফ্ল্যাট আছে। একাই থাকেন সেখানে।

এখন তিনি টুকটাক ব্যবসা করেন। গাজীপুরে এক বন্ধুর সাথে মশার কয়েল কারখানা দিয়েছিলেন। তিন মাস পরে বুঝলেন, বাংলাদেশে মানুষ যত না মশা মারে, তার চেয়ে বেশি মশা মানুষদের মারে।

তারপর চট্টগ্রাম থেকে শুঁটকি মাছ আমদানি-রপ্তানির ব্যবসায় ঢুকলেন। সেখানে গিয়ে বুঝলেন, শুঁটকি মাছের চেয়ে শুকনা মানুষ বেশি ভয়ংকর।

শেষমেশ তিনি স্থির করলেন, ব্যবসা চলুক নিজের গতিতে, তিনি পৃথিবী ঘুরে বেড়াবেন।

তবে প্যারিস, লন্ডন, দুবাই টাইপের জায়গায় তিনি যাবেন না। তিনি যাবেন সেইসব জায়গায়, যেখানে মানুষ কম যায়, কিন্তু গল্প বেশি।

সময়টা তখন ২০০২ সাল। ডিসেম্বরের ঢাকায় তখন হালকা শীতের আমেজ।

রাস্তায় নতুন নতুন সিএনজি নেমেছে। পুরোনো বেবিট্যাক্সি আস্তে আস্তে উঠে যাচ্ছে। শহরের মানুষ গালি দিচ্ছে, আবার সেই সিএনজিতেই উঠছেও।

বাংলাদেশের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিভা সম্ভবত সবকিছুর সাথে মানিয়ে নেওয়া। যে জাতি লোডশেডিংয়ের মধ্যে মোমবাতি জ্বালিয়ে মাছ ভেজে খেতে পারে, তাদের হারানো কঠিন।

রাশেদের জীবনে টাকার সমস্যা কোনোদিন ছিল না। দিনাজপুরে তাদের বহু পুরোনো বনেদী জমিদার পরিবার। স্বাধীনতার পরে অবশ্য এখন আর সেই জমিদারি নেই, কিন্তু জমিদারদের বুদ্ধিটা রয়েই গেছে।

তার বাবা ধান-চাউলের আড়ৎ, কোল্ড স্টোরেজ, আলুর ব্যবসা, চালকল—সবকিছু ধরে রেখেছিলেন।

এখনো দিনাজপুর শহরের একটু বাইরে তাদের বিশাল বাড়িটা দাঁড়িয়ে আছে। লাল দোতলা ভবন। সামনে পুকুর। পিছনে আম আর লিচুর বাগান।

ঘরের ভেতরে পুরোনো দিনের গন্ধ—পিতলের থালা, সেগুন কাঠের আলমারি, আর সাদা-কালো ছবিতে গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মৃত পূর্বপুরুষগণ।

ছোটবেলায় রাশেদের ধারণা ছিল, টাকা থাকলে মানুষ সুখী হয়। বড় হওয়ার পর তিনি বুঝলেন, টাকা মানুষকে দুশ্চিন্তা থেকে বাঁচায়, কিন্তু একাকীত্ব থেকে না।

তার বিয়েটা টেকেনি। তাদের বিচ্ছেদ টা খুব খারাপ বিচ্ছেদও ছিল না। আবার খুব শান্তিপূর্ণও ছিল না।

দুইজন মানুষ একসময় বুঝে ফেলেছে, একই ছাদের নিচে থাকলে দুইজনেরই মেজাজ ক্রমাগত খারাপ হতে থাকবে। এরপর আলাদা হয়ে গেছে।

ছেলেমেয়ে হয় নাই। ঝামেলাও নাই।

অবসরের পরে প্রথম কয়েক মাস তিনি ভয়ংকর বিষণ্ন হয়ে পড়েছিলেন। সকালে ঘুম থেকে উঠে বুঝতে পারতেন না, আজ তার কাজ কী।

সরকারি চাকরি মানুষের আত্মার ভেতরে একটা টাইমকার্ড ঢুকিয়ে দেয়। আপনি অফিসকে ঘৃণা করবেন ঠিকই, কিন্তু অফিস ছাড়া নিজের অস্তিত্বও ঠিকমতো খুঁজে পাবেন না।

এই শূন্যতা থেকেই তার মাথায় অদ্ভুত একটা আইডিয়া আসে।

তিনি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা অমীমাংসিত রহস্যগুলো দেখতে যাবেন। সেগুলোকে কাছ থেকে অনুভব করবেন। স্থানীয় মানুষের কাছে ওসবের গল্প শুনবেন।

কিন্তু কোনো রহস্যের সমাধান জানার চেষ্টা করবেন না। তিনি তো গোয়েন্দা না, গবেষণাও করবেন না। শুধু দেখেই শখ মেটাবেন।

তার যুক্তি ছিল খুব সহজ- "রহস্যের সৌন্দর্য তার উত্তরহীনতায়। সব উত্তর জেনে ফেললে জীবন সরকারি ফাইল হয়ে যায়।”

তিনি ঠিক করেছিলেন এইসব অভিযাত্রায় তার সঙ্গী হবেন দুইজন।

প্রথমজন শাহীন তালুকদার। রাশেদের ছোটবেলার বন্ধু। সেও দিনাজপুরের মানুষ। শহরের ডায়াবেটিস হাসপাতালের পাশেই তার তিনতলা বাড়ি। নিচতলায় আর তিনতলায় ভাড়াটিয়া, দ্বিতীয় তলায় সে থাকে। ছাদে কবুতর পালে।

শাহীন জীবনে খুব বেশি কিছু করতে পারেনি, কিন্তু আশ্চর্য রকম সুখী একজন মানুষ। তার একমাত্র ছেলে সুমন বুয়েট থেকে কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ে তখন আমেরিকায় গুগলে চাকরি করে।

শাহীন তখনও পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারেনি গুগল আসলে কী। ২০০২ সালের দিকে সবার ধারণা ছিলোও না সেভাবে।

যখন কেউ জিজ্ঞেস করতো, “আপনার ছেলে কী করে?”

সে গম্ভীর মুখে উত্তর দেয়, “কম্পিউটার কোম্পানিতে বড় চাকরি করে। আম্রিকায়। কোটি কোটি মানুষ ওর বানানো জিনিস ব্যবহার করে।"

কাছের মানুষদের অবশ্য বলতো - আসলে ঠিক কী করে, সেটা ওর মা-ও জানে না।

একবার দিনাজপুর স্টেশন ক্লাবে বিয়ের আসরে এক ব্যবসায়ী তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “গুগল মানে কি ওই যেটা দিয়ে গান ডাউনলোড করে?”

শাহীন সিগারেট ধরিয়ে বলেছিল, “হইতে পারে। আমিও পুরোপুরি বুঝি না। তবে ডলার পাঠায় নিয়মিত।”

দ্বিতীয় সঙ্গী রাফি।

রাশেদের ভাগ্নে। গাজীপুরের আইইউটির মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র। সিজিপিএ ৩.৯। ভয়ংকর মেধাবী।

রাফি হচ্ছে সেই ধরনের ছেলে, যারা ক্লাসে চুপচাপ বসে থাকে কিন্তু পরীক্ষার আগের রাতে পুরো হল তাদের ক্লাসনোটের ফটোকপির পেছনে দৌড়ায়।

রাফির সমস্যা হচ্ছে, সে পৃথিবীর সবকিছু বিজ্ঞানের সূত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করতে চায়। তার কাছে ভূত মানে মানসিক বিভ্রম, অলৌকিকতা মানে অপটিক্যাল ইলিউশন, আর প্রেম মানে হরমোনাল ডিসঅর্ডার।

রাশেদ একদিন ওকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “তোর কি কোনোদিন প্রেমটেম হয় নাই?”

রাফি খুব শান্তভাবে বলেছিল, “মানুষ প্রেমে পড়লে তাদের প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়।” এমনিতেই তখন ওদের আইইউটি তে মেয়েরা পড়তো না, তার ওপর এরকম নারীবিদ্বেষী মনোভাব দেখে অবাকই হয়েছিলেন তিনি।

শাহীন তখন পাশে বসে চা খাচ্ছিল। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেছিল, “এই পোলাপান গুলারে আল্লাহ কোন মাটি দিয়া বানাইছে কে জানে!”

সময়টা ২০০২ সালের ডিসেম্বর। দেশে তখন রাজনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় মাঝেমধ্যেই মারামারি হয়। পত্রিকায় দুর্নীতির খবর দিয়ে ভর্তি। ডলারের দাম হুহু করে বাড়ছে।

কিন্তু এসবের মাঝেও ঢাকার মানুষ নিউমার্কেটে শপিং করছে, বিয়েতে বিরিয়ানি খাচ্ছে, আর শুক্রবারে সিনেমা দেখছে।

বাংলাদেশে জীবন থামে না। শুধু একটু কাত হয়ে হাঁটে।

স্কটল্যান্ডে যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করেই নেয়া।

এক সন্ধ্যায় রাশেদ সাহেব রিডার্স ডাইজেস্ট ম্যাগাজিনে একটা আর্টিকেল পড়ছিলেন। স্কটল্যান্ডের উত্তরের এক ছোট্ট দ্বীপ আছে—আইলিন মোর।

সেখানে ১৯০০ সালে তিনজন লাইটহাউজ গার্ড হঠাৎ করেই উধাও হয়ে যায়। কোনো লাশ নাই। কোনো চিহ্ন ছিল না। শুধু খালি বাতিঘর।

আর্টিকেল টা পড়া শেষ হওয়ার পর তিনি চুপচাপ বসে রইলেন।

তারপর শাহীন কে ফোন দিয়ে বললেন, “চল।”

সে জিজ্ঞেস করল, “কোথায়?”

“স্কটল্যান্ড।”

সে তখন টোস্ট বিস্কুট দিয়ে চা খাচ্ছিল। খেতে খেতেই বলল, “ওখানে কি হালাল হোটেল আছে?”

“না থাকলে তুই ঘাস খাবি।”

“আমি ঘাস হজম করতে পারি না মিয়াভাই।”

স্কটল্যান্ডে নামার পর প্রথম যে জিনিসটা রাশেদের চোখে পড়ল, সেটা হচ্ছে আকাশের রং। ঢাকার আকাশের মতো না একেবারেই। এই আকাশ দেখে মনে হয়, কেউ পুরান কম্বল ধুয়ে মেলে রাখছে।

এডিনবার্গ শহর সুন্দর। ভয়ংকর সুন্দর। পুরানো পাথরের বাড়ি। সরু রাস্তা। বাতাসে ঠান্ডা আর ইতিহাসের গন্ধ।

শাহীন প্রথম দিনই বিপদে ফেললো। তারা খাবার খেতে গেছে একটা রেস্তোরাঁয়। স্কটিশ ওয়েট্রেস এসে জিজ্ঞেস করল, “How spicy do you want your food?”

শাহীন আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “Yes.”

মেয়েটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে ছিল। তারপর নোটবুকে কি যেন লিখে চলে গেল।

পনেরো মিনিট পরে এমন এক খাবার আসল, যা খেয়ে শাহীনের চোখ দিয়ে পানি, নাক দিয়ে পানি, এবং সম্ভবত আত্মা দিয়েও পানি বের হচ্ছিল।

সে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এই মাইয়া আমারে খুন করতে চাইছে।”

তিনদিন পরে তারা রওনা দিল আইলিন মোরের দিকে। ছোট্ট একটা দ্বীপ। আটলান্টিকের বাতাস এমনভাবে এর উপর আছড়ে পড়ে, যেন পৃথিবীর উপর ব্যক্তিগত আক্রোশ আছে তার।

ফেরিতে যেতে যেতে শাহীন বলল, “রহস্যের আসল সমস্যা কী জানেন?”

রাশেদ জানালা দিয়ে সমুদ্র দেখতে দেখতে বললেন, “কি?”

“মানুষ সবকিছুর ব্যাখ্যা চায়। অথচ পৃথিবীতে অনেক ঘটনা আছে, যেগুলা ব্যাখ্যা পছন্দ করে না।”

রাশেদ সাহেব হাসলেন।

এই লোকটা মাঝে মাঝে এমন কথা বলে, মনে হয় সে কবুতর না, দর্শন পালন করে।

দ্বীপে পৌঁছানোর পর তারা যে গেস্টহাউসে উঠল, সেটা চালায় এক বৃদ্ধা মহিলা। নাম মিসেস ম্যাকগ্রেগর।

তিনি তাদের দেখে জিজ্ঞেস করলেন, “Tourists?”

রাশেদ বললেন, “Not exactly.”

“Ghost hunters?”

রাফি আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো, “সত্যিই ভূত আছে নাকি?”

বৃদ্ধা শান্তভাবে বললেন, “Depends on who’s asking.”

এরপর থেকে শাহীন আর একা বাথরুমেও যায় নাই।

বাতিঘরটা এখন আর ব্যবহৃত হয় না। পাথরের উপর ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, কোনো বৃদ্ধ মানুষ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে আছে।

তিনজন কর্মী ছিল সেখানে। থমাস মার্শাল। জেমস ডুকাট। ডোনাল্ড ম্যাকআর্থার।

একদিন জাহাজ এসে দেখে—সব খালি। ঘড়ি বন্ধ।খাবার টেবিলে পড়ে আছে। একটা চেয়ার উল্টে আছে।

কিন্তু মানুষ নাই। এই ঘটনা নিয়ে হাজার তত্ত্ব।

কেউ বলে সমুদ্রের ঢেউ টেনে নিয়েছে। কেউ বলে খুন।কেউ বলে অতিপ্রাকৃত কিছু।

শাহীন অবশ্য নিশ্চিত ছিল, “এখানে জ্বিন আছে।”

রাশেদ বলল, “তুই জ্বিন দেখছিস কখনও?”

“না। কিন্তু পরিবেশ তো সন্দেহজনক।”

রাতের দিকে তারা বাতিঘরের কাছে গেল আরেকবার।

স্কটল্যান্ডের বাতাসে এক ধরনের বিষণ্নতা আছে। মনে হয়, পৃথিবীর সব পুরানো দুঃখ এখানে এসে জমা হয়েছে।

রাশেদ পাথরের উপর দাঁড়িয়ে সমুদ্র দেখছিলেন। তার হঠাৎ মনে হল, মানুষের জীবনও এক ধরনের বাতিঘর। দূর থেকে আলো দেয়। কাছ থেকে দেখলে ফাঁকা।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, মানুষ যাদের ভুলে যেতে চায়, তাদেরই সবচেয়ে বেশি মনে পড়ে ঠান্ডার দেশে।

শাহীন সিগারেট ধরিয়ে বলল, “আপনি কি মনে করেন, ওরা মারা গেছিল?”

“সবাই তো একদিন মরে।”

“না। আমি বলতেছি, কীভাবে?”

রাশেদ চুপ। তারপর বললেন, “আমার মনে হয়, মানুষ কখনো কখনো নিজের ইচ্ছায় হারিয়ে যায়।”

শাহীন ভয় পাওয়া গলায় বলল, “মিয়াভাই, এইসব কথা রাতে বলিয়েন না।”

সেই রাতেই একটা ঘটনা ঘটল। গেস্টহাউসে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে গেল। বাইরে ঝড়। জানালায় বাতাস আঘাত করছে।

শাহীন কম্বল মুড়ি দিয়ে বসে আছে। তার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে, রাষ্ট্রীয়ভাবে ইমার্জেন্সি ঘোষণা করা হয়েছে।

হঠাৎ উপরের তলা থেকে শব্দ এল। টক। টক। টক।

শাহীন প্রায় কেঁদে ফেলল। “ওইটা কী?”

রাফি শান্তভাবে বলল, “কাঠের বাড়ি। শব্দ হবেই।”

আবার শব্দ হলো। টক। টক। টক।

রাশেদ টর্চ নিয়ে উপরে উঠলেন। তার সাথে রাফি।

শাহীন নিচে বসে সূরা ফালাক পড়তে লাগল। মাঝে মাঝে ভুল করে জাতীয় সংগীতও গেয়ে উঠছিল।

উপরে গিয়ে দেখা গেল, জানালার পাশে একটা পুরানো দোলনা চেয়ার নিজে নিজে নড়ছে। বাতাসে।

তবে দৃশ্যটা অস্বস্তিকর বটে। রাফি চেয়ারটার দিকে তাকিয়ে বলল, “ভূতের চেয়ে মানুষের কল্পনা বেশি ভয়ংকর।”

রাশেদ ওকে কিছু বললেন না। কারণ ঠিক তখনই তিনি লক্ষ্য করলেন—দেয়ালে ঝুলানো পুরানো ছবির একজন মানুষের চোখ অদ্ভুতভাবে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।

অবশ্য পরে কাছে গিয়ে বুঝা গেল, ছবিটা এমনভাবেই আঁকা। তবু সেই মুহূর্তে তার বুকের ভেতর হালকা ঠান্ডা নেমেছিল।

পরদিন সকালে তারা স্থানীয় এক বৃদ্ধ জেলের সাথে কথা বলল। লোকটার নাম অ্যাঙ্গাস। মুখের বলিরেখা দেখে মনে হয়, জীবনে অন্তত সাতশো ঝড় হজম করেছে।

তিনি বললেন, “সমুদ্র কাউকে নেয়, কাউকে ফেরত দেয়। কিন্তু কিছু মানুষ আছে, যাদের সে নিজের কাছে রেখে দেয়।”

শাহীন সঙ্গে সঙ্গে বলল, “দেখছেন? আমি যা বলছিলাম।”

অ্যাঙ্গাস হেসে ফেলল। তার দাঁত প্রায় সব পড়ে গেছে। কিন্তু তারপরও ওর হাসিটা সুন্দর।

“তোমরা শহরের মানুষ সবকিছুর উত্তর খোঁজো। এখানে আমরা শিখেছি, কিছু প্রশ্নকে একা থাকতে দিতে হয়।”

রাশেদ সাহেব চুপচাপ শুনলেন। তার মনে হচ্ছিল ওকে বলেন, তিনি আসলে কোনো রহস্য সমাধান করতে আসেন নাই। তিনি এসেছেন রহস্যের পাশে দাঁড়াতে।

এই পৃথিবীতে কিছু অন্ধকারের দরকার আছে। সবসময় আলোয় ঝলমল ভালো লাগে না।

ফেরার আগের রাতে তারা ছোট্ট এক পাবে বসেছিল। বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। ভেতরে স্কটিশ গান চলছে। এক বৃদ্ধ ব্যাগপাইপ বাজাচ্ছে।

অরেঞ্জ জুসের গ্লাস হাতে রাফি বলল, “মামা, আপনি খেয়াল করছেন, রহস্যের জায়গাগুলা সবসময় সুন্দর হয়?”

“হুম।”

“কারণ কুৎসিত জায়গায় মানুষ রহস্য বানানোর সময় পায় না।”

শাহীন তখন স্কচ হুইস্কির দ্বিতীয় গ্লাসের পরে পাবের এক স্কটিশ বুড়োর সাথে অদ্ভুত উচ্চারণে ইংরেজি বলার চেষ্টা করছিল।

“আজকে আমাদের মইধ্যে একটা… কী বলে… স্পিরিচুয়াল কানেকশন হয়ে গেছে।”

পাশের স্কটিশ বুইড়া কিছু বুঝে না বুঝে মাথা নাড়ল।

রাশেদ হাসলেন। বয়স বাড়লে মানুষ আসলে আনন্দ না, শান্তি খোঁজে। আর শান্তি খুব অদ্ভুত জিনিস।

কখনো একটা কুয়াশাচ্ছন্ন দ্বীপে পাওয়া যায়। কখনো পুরানো বন্ধুর সাথে চুপচাপ বসে থাকলেও কেউ পায়। কখনো রহস্যের উত্তর না জানার মধ্যেও শান্তি লুকিয়ে থাকে।

ঢাকায় ফেরার সময় প্লেনে রাফি বলল, “মামা, আমরা পরেরবার কোথায় যাইতে পারি?”

রাশেদ সাহেব জানালার বাইরে মেঘ দেখতে দেখতে বললেন, “মিশর।”

“ওখানে কী রহস্য?”

শাহীন বলল, “মমি।” তারপর ধীরে ধীরে বলল, “মরা মানুষরে কাপড় পেঁচাইয়া রাখে কেন?”

রাশেদ চোখ বন্ধ করলেন। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি।

পৃথিবী বড় বিচিত্র জায়গা। আর রহস্যের চেয়েও বিচিত্র হচ্ছে মানুষ। বিশেষ করে বোকা মানুষ।

27/05/2026

মুম্বাই শহরটা রাতে সবচেয়ে সুন্দর লাগে। যখন দূরে আরব সাগরের ওপর আলো পড়ে, লোকাল ট্রেনের জানালায় ক্লান্ত হয়ে মানুষ ঘুমায়, আর ফিল্ম সিটির সেটে নকল বৃষ্টি নামানো হয়।

রফিক তখন রাতের শেষ সিগারেটটা খায়।

সস্তা বিড়ি না। এখন সে “গোল্ড ফ্লেক” খায়। কারণ সে এখন “ইন্ডাস্ট্রির লোক”।

সে ফিল্মে কাজ করে। মানে, শাহরুখ খানের পাশে দাঁড়িয়ে “স্যার গাড়ি রেডি” বলা টাইপ কাজ না। তারও কয়েক ধাপ নিচে।

সে সেটে লাইট টানে, কেবল বহন করে, মাঝে মাঝে জুনিয়র আর্টিস্টও হয়। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে “ভারত মাতা কি জয়” বলে মুখ নাড়ায়।

ক্যামেরায় তাকে কখনও বোঝা যায় না। তার জীবনটাও ওইরকম। ঝাপসা।

---

রফিকের পুরো নাম মোঃ রফিকুল ইসলাম। কিন্তু মুম্বাইয়ে সে “রফিক শেখ”।

এই নামটা তাকে দিয়েছিল এক দালাল। নাম পাল্টাতে ১২ হাজার রুপি লেগেছিল। ওই টাকায় ভোটার আইডি, আধার, রেশন কার্ড—সব হয়ে যায়।

লোকটা বলেছিল—“ভাই, ইন্ডিয়াতে মানুষ জন্মের আগেই আধার পেয়ে যায়। টেনশন নিও না।”

রফিক তখন হাসছিল। পরে বুঝেছে, এটা কথার কথা না। আসলেই সম্ভব।

---

সে থাকে গরীবনগরে। বান্দ্রার পাশেই। রেলের জমি দখল করে বানানো বস্তিতে। এখানের বেশিরভাগ লোক বাংলাদেশের৷ নামের মতোই এখানের সব বাসিন্দারা আসলেই গরীব।

এই যে বর্ষা শুরু হবে, তখন সেখানে ড্রেন আর রাস্তার মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকবে না। পলিথিনের ছাউনি ফুটো হয়ে পানি পড়বে।

তবু ঘরের মালিককে মাসে ভাড়া দিতে হবে চার হাজার রুপি।

দশ বাই বারো এর এক রুমে রফিক, তার বউ নাসরিন, আর দুই মেয়ে থাকে।

বড় মেয়ের নাম মাহিরা। ছোটটার নাম আলিশা। দুইজনই হিন্দি বলে। বাংলা বুঝে, কিন্তু বলতে লজ্জা পায়। রফিক কষ্ট পায়।

তার মেয়ে একদিন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল— “আব্বু, বাংলাদেশ কি নেপালের চেয়ে বড়ো নাকি ছোট?”

সে চুপ করে ছিল।

---

ওর বউ, নাসরিন, গুজরাটি মুসলিম। তার বাবা সুরাটে কাপড়ের ব্যবসা করত। মেয়ে পালিয়ে বিয়ে করায় এখনো কথা বলে না।

নাসরিন মাঝে মাঝে ঝগড়ার সময় বলে—“তুমি তো ইন্ডিয়ানই না।”

রফিক তখন রেগে গিয়ে বলে—“আমার আধার কার্ড আছে!”

তারপর দুজনেই চুপ হয়ে যায়। কারণ এগুলো অস্বস্তিকর সত্য, কারওই ভালো লাগে না।

---

রফিক প্রথম মুম্বাই আসে ২০০৮ সালে। রাজশাহীর তানোর উপজেলা থেকে। তখন তার বয়স উনিশ।

পদ্মার চরে বাড়ি ওদের। বাবা স্কুলের দপ্তরি ছিল। মা হাঁস মুরগি পালত। চার ভাইবোন ওরা।

রফিকের এক মামা থাকতো মুম্বাইয়ে। উনিই একবার ঈদের পরে বাসায় আসছিলেন, কথায় কথায় বলেছিলেন—“আরে মুম্বাইতে টাকা উড়ে।”

টাকা উড়েছিল ঠিকই। তবে তার বাবার ছেঁড়া পকেট থেকে। বিশ হাজার টাকা সম্বল করে ও চলে এসেছিল মহারাষ্ট্রের রাজধানীতে।

প্রথমে সে হোটেলে বাসন মাজত। পরে এক বাংলাদেশি ভাই তাকে ফিল্ম সিটিতে নিয়ে যায়।

সেদিন সে প্রথম দেখে বিশাল সেট। নকল হাসপাতাল। নকল আদালত। নকল মন্দির। নকল বস্তি।

শুধু গরীব লোকগুলো আসল, জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়া খাঁটি গরীব। যেধরনের গরীবকে সেফুদা গালি দেয় মদ খেয়ে।

---

একবার এরকম সালমান খানের শুটিং হচ্ছিল।

রফিক তখন জেনারেটরের তার টানছে। হঠাৎ সালমান পাশ দিয়ে গেল। সবাই “ভাই ভাই” করে চেঁচাচ্ছে। রফিকের সেদিকে খেয়াল নেই।

তার পেঁচিয়ে সালমান হুমড়ি খেয়ে ফ্লোরে পড়ে গেলো। এই দেখে ভাইয়ের বডিগার্ড এসে রফিককে মারল একটা চড়। সালমান খান দেখলো, কিন্তু কিছু বললো না।

রফিক পরে ফোনে দেশে মাকে বলল—“আম্মা, আজকে সালমান খানকে দেখছি।”

আম্মা জিজ্ঞেস করল—“ও কি তোদের এলাকার চেয়ারম্যান?”

---

ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে অনেক বাংলাদেশি কাজ করে।
কেউ স্পটবয়। কেউ কার্পেন্টার। কেউ ভিড়ের লোক সাজে। তার কাজ ভিড়ের ভেতর থেকে মাথা উঁচিয়ে এদিক ওদিক তাকানো।

এখানে সবাই নাম পাল্টে বেঁচে আছে। একজনের আসল নাম ছিল জাহাঙ্গীর। এখন সে “জ্যাকি”। ড্রাইভারের কাজ করে, রণবীর সিংয়ের গাড়ি চালায়।

আরেকজন আছে মাদারীপুরের ফরিদ। সে এখন “ফারহান কাদির”। অনেক মুভিতে ভিএফএক্সের কাজ করে, মূলত ফিল্ম এডিটর, নীলক্ষেতের কম্পিউটার স্পেশালিষ্ট ছিল এককালে।

মুম্বাই মানুষকে বদলে ফেলে। কেউ হিরো হয়। কেউ নাগরিক। কেউ আবার নিজেকে হারিয়ে খুঁজে।

---

রফিক পাঁচ বছর পরপর দেশে যায়। একাই যায়। বউ বাচ্চারা কেউ আসে না, আসতে চায় না। মালদহ জেলার মহদিপুর সীমান্ত হয়ে চাঁপাইয়ের সোনামসজিদ দিয়ে ঢুকে।

প্রতিবার বর্ডার পার হতেই তার ভয় লাগে। ইমিগ্রেশন অফিসারের দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারে না।

যদিও এখন তার ভারতীয় পাসপোর্ট আছে। তবু ভিতরে ভিতরে মনে হয় কেউ হয়তো চিৎকার দিয়ে বলবে—“এই লোকটা নকল!”

দেশে গেলে সে স্মার্টফোন বের করে। ওর ভাগ্নেরা ওকে ঘিরে ধরে। সবাই ভাবে সে অনেক বড়লোক।

কারণ সে “মুম্বাই থাকে”।

একবার গ্রামের এক ছেলে জিজ্ঞেস করেছিল—“শাহরুখ খানের বাসার সামনে গেছিস কখনো?”

রফিক বলল—“গেছি।”

—“নাম কি যেন?”

—“মান্নাত"

তার বাবা এখন আর হাঁটতে পারে না। মা ডায়াবেটিসে শুকিয়ে গেছে। তারা এখনো ভাবে ছেলে “বড় অফিসে চাকরি করে”।

রফিক সত্যিটা বলে না। কী বলবে? “আমি সারাদিন কারেন্টের তার টানি, রাতে ড্রেনের পাশে ইঁদুরের সাথে ঘুমাই”?

---

গরীবনগরে রাতে অদ্ভুত শব্দ হয়।

লোকাল ট্রেন। কুকুরের ডাক। পানির লাইনে ঝগড়া, বাথরুম নিয়ে ঝগড়া। বাচ্চার কান্না। আর দূরে আজানের শব্দ।

বাংলাদেশি বস্তিতে সবাই রাজনীতি বোঝে।

কেউ বলে “ভারত আমাদের খাইতে দিছে।” কেউ বলে “সব মুসলমানরে তাড়াইতেছে।” কেউ বলে “বাংলাদেশে গেলে খামু কী?”

তারপর সবাই একেবারে চুপ করে যায়, চিন্তা করতে থাকে।

---

একদিন খবর এল—বস্তি ভাঙা হবে। রেলের জমি উদ্ধার করা হবে।

সকালে বুলডোজার চলে আসলো। পুলিশ আসলো। টিভির সাংবাদিকরা আসলো।

এক মহিলা কাঁদতে কাঁদতে বলে—“আমরা কই যামু?”

পাশে দাঁড়িয়ে এক পুলিশ বলল—“বাংলাদেশ।”

পুলিশটার নাম কি ভিখু মাত্রে ছিলো? এই নামে 'সত্য' নামের একটা সিনেমা ছিল না, রামগোপাল ভার্মার?

---

রফিক তখন কাজে গেছিল। ফিল্ম সিটিতে একটা সিরিজের শুটিং চলতেছিল।

নকল দাঙ্গার দৃশ্য সাজানো হয়েছে। আগুন লাগানো হয়ে গেছে। লোকজন এদিক সেদিক দৌড়াচ্ছে আর নায়ক চিৎকার করছে—“এই দেশ সবার!”

ঠিক তখনই নাসরিন ফোন দিল।

—“আমাদের ঘর ভাঙতে আসছে!”

শুনে রফিক কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলো। ওর হাতে তখন নকল রক্ত মাখা কাপড়। মাথায় দিয়ে শুয়ে পড়বে, ওর অভিনয় 'লাশ' হওয়ার।

সে সুপারভাইজারকে বলল—“সাহেব, বাসায় একটু প্রব্লেম হইছে।”

সুপারভাইজার বলল—“আজ শুটিং শেষ না করে গেলে কিন্তু টাকা পাইবা না।”

একথা শোনার পরে রফিক আবার কাজে ফিরে গেল। মাথায় লাল রঙের কাপড় জড়িয়ে শুয়ে থাকলো মরা মানুষ সেজে।

শালার গরীব মানুষের জীবনে ট্র্যাজেডিরও টাইম মেনে আসা লাগে।

---

রফিক রাতে বস্তিতে ফিরে দেখে ওর অর্ধেক ঘর ভাঙা। মাহিরা কাঁদছে। আলিশা প্লাস্টিকের একটা গামলা ধরে বসে আছে।

নাসরিন একেবারে চুপ করে আছে। চুপ থাকা মেয়েদের বেশি ভয় লাগে।

রফিক ওর পাশে গিয়ে বসলো। হঠাৎ তার হাসি পেল। সে হাসতে লাগল।

নাসরিন অবাক হয়ে বলল—“পাগল হইছেন নাকি আপনি?”

রফিক বলল—“জানো, আজ আমি ফিল্মে বস্তি বাঁচাইতেছিলাম। এমন চেষ্টা করছি যে মইরাই গেছি শেষমেষ। অথচ দেখো, নিজের ঘরটাই বাঁচাইতে পারলাম না।”

তারপর আবার হাসতে লাগলো। হাসতে হাসতে ওর চোখে পানি চলে আসছে।

---

পরদিন খবরের চ্যানেলে রিপোর্ট চলল—

“অবৈধ বাংলাদেশি উচ্ছেদ অভিযান চলছে।”

ক্যামেরায় কয়েক সেকেন্ডের জন্য রফিককেও দেখা গেল। সে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় সে আবার শুটিংয়ে গেল। কারণ জীবনে যত বড় ট্র্যাজেডিই হোক, মুম্বাইয়ে কলটাইম মিস করা যায় না।

---

সেই রাতে শাহরুখ খানের একটা পুরনো ডায়ালগ মনে পড়ছিল তার। বাজিগর মুভির ডায়ালগ।

“কভি কভি জিতনে কে লিয়ে হারনা পড়তা হ্যায়।”

রফিক সিগারেট ধরাল। ভাবছিল—সে আসলে কোন দেশের মানুষ? সে কি জিতবে কোনও দিন? নাকি শুধু হেরেই যাবে?

বাংলাদেশে গেলে তাকে “ইন্ডিয়ান” বলে। আর ভারতে সে “বাংলাদেশি” (অবৈধ)।

তার মেয়েরা বাংলা জানে না। আবার ওর মা হিন্দি কিছুই বোঝে না।

তার পাসপোর্ট আসল। জীবনটা নকল।

টিনের চালের ওপর বৃষ্টি পড়ে। মুম্বাইয়ের বর্ষাকাল মারাত্মক। নাসরিন ঘুমিয়ে থাকে। মেয়েরা গাদাগাদি করে শুয়ে।

রফিক বাইরে বসা। দূরে লোকাল ট্রেন যাচ্ছে।
মুম্বাই শহর কখনও ঘুমায় না।

সে ফোন বের করে গ্রামের ছবি দেখে। পদ্মার চর।
কাঁচা রাস্তা। বাবার পুরনো সাইকেল। মায়ের রান্নাঘর।

হঠাৎ ওর মনে হলো—সে যদি একদিন সত্যিই ওর গ্রামে ফিরে যায়? কিন্তু ফিরে যাবেটা কোথায়?

ওপারে তার শৈশব। এপারে তার সন্তান, সংসার।

মানুষের সবচেয়ে বড় বেদনা সম্ভবত দেশহীন হওয়া না, দুইটা দেশ থাকার পরও একটাও 'নিজের' না হওয়া।

বৃষ্টি তখন আরও জোরে নামছে।

রফিক বিড়ির শেষ টান দিয়ে মনে মনে বলে—

—“এই শহরটা মানুষরে খায়। কিন্তু ছাড়েও না।”

Address

Dhaka

Website

Alerts

Be the first to know and let us send you an email when Sharif Hassan Writes posts news and promotions. Your email address will not be used for any other purpose, and you can unsubscribe at any time.

Shortcuts

Share