01/05/2025
#সময়ের_সঙ্গী
২
দশ কেজি মাংস আনলাম অথচ আমার পাতের মাংস কই রিমা?শুধু ডাল-ডিম কেন?তুমি তো জানোই মাংস আমার কতো প্রিয়।
আমি অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকালাম আরিফের দিকে।
মিনমিনে গলায় বললাম,"শেষ হয়ে গেছে।আর বাকি যা আছে আপারাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য রাখা হয়েছে।"
আরিফকে এবার মাথা নত করে বসে থাকতে দেখলাম।মুখটা দেখে প্রচন্ড মায়া হলো আমার।
আরিফ উঠে দাড়িয়ে বললো,"আজ পেট ভরে খাবো দেখে তারাতারি বাড়ি ফিরলাম।
ধ্যাত আর খাবোই না আমি।"
খাবারের থালাটি একপ্রকার টেবিলে ছুড়ে রেখেই চলে গেল সে।
আমি বার বার ডেকেও কোনো সারা পেলাম না।
নিজের প্রতি হওয়া অন্যায়ের প্রতিবাদ না করলেও এটা নিয়ে আমি অবশ্যই কথা বললো।
আসলে কী, নিজের খাবার নিয়ে ঝগড়া করাটা ভীষণই মন্দ দেখাই।তাই করিনা।আমার পরিবার ও আমায় এমন শিক্ষা দেয়নি।
আরিফের প্লেট নিয়েই ডাইনিং এ গেলাম।
দেখলাম শাশুড়ি মা ও ননদেরা বসে গল্প করছে।তাদের শশুর বাড়ির মানুষেরা খেয়ে বিদায় নিয়েছে।
ননদেরা যাবে সন্ধ্যায়।
আমি খাবারের টেবিলে থালা রেখে বললাম,"মাংসের বাটি গুলো ডিপে নাকি নর্মালে রেখেছেন মা?
বের করে গরম করবো।এসব দিয়ে আপনার ছেলে খাবে না।"
মূলত এটা জানানোর কারণ হলো,আমি যে মাংস নিচ্ছি তা বোঝানো।
না বলে নিলে চোরের অপবাদ দেবে।এর আগেও দিয়েছিল।ব্যাপারটা আমার মা-বাবা পযর্ন্ত পৌঁছে দিয়ে তাদেরও হেনস্তা করেছিল।
মা মুখ কুচকে বললেন,"তোমার কী কথা কানে যায়না রিমা?
মাংস রেখেছি মাত্র কেজি তিনেক তিন বাটিতে।আমার তিন মেয়ের জন্য।এই তো সামান্য,এখান থেকে আবার তুমি নিলে ওরা খাবে কী!"
আমি চটপট বললাম,"টাকা আপনার ছেলের।মাংস এনেছে সে নিজে।আর তার ভাগ্যে দু-টুকরো পরবে না এটা কোনো কথা?"
শুরু হলো শাশুড়িমার বিলাপ।
কেঁদেকেটে বললেন,"ছেলেকে কী খাইয়ে জন্ম দেইনি আমি?
সামান্য মাংস নিয়ে আমার মেয়েদের সঙ্গে হিংসা করে।
আমার এই ঘরবাড়ি সব তো ছেলেই পাবে।মেয়েরা কী পাবে?
পরের বাড়ি গিয়েছে মেয়ে তিনটে।খুব বেশি কী আসে?"
"তাও সপ্তাহে দু-দিন করে তো আসেই মা।"
বড়ো ননদ জ্বলে উঠে বললো,"হ্যা আমরা আসি,খাই সেটাই তোমার সহ্য হয় না।
আসলে মাংস আরিফ নয়,খাবে হলে তুমি।নিজের নাম বলতে না পেরে আরিফের ওপর চাপাচ্ছো।"
"আমার মা-বাবা আমায় যথেষ্ট খাইয়েছেন।
খাবার নিয়ে ছোটলোকি আমার স্বভাব নয়।"
ননদ আরো কিছু বলতে নেবে তার আগেই শাশুড়ি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললো,"মেয়েরা আসে আমার তোমার উপকারেই।তোমায় সাহায্য করতে।"
আমি জবাব দিলাম,"ঠিক কী সাহায্য করে আপনার মেয়েরা?
ওরা আসলেও রান্না করি আমি,কাপড় কাচাঁ,বাসন মাজা,ঝাড়-পোচ থেকে শুরু করে সবই আমি করি।
দেখুন মা,আপনার মেয়েরা আসুক খাক তাতে আমার কোনো অসুবিধা নেই।
এই যে আপনি মাস দুয়েক পরপরই তাদের শশুর বাড়ির দশ-পনেরো জন দাওয়াত দেন, পুরো মাসের খরচের তিনভাগ একদিনই খরচ করেন।পরে মাস কাবার দিতে অন্যের দিকে ধার কিংবা বন্দক বিক্রি করতে হয়।
এসব করতে করতে ঋনের বোঝা বেড়ে গেছে লাক খানিক।চিন্তায় আপনার ছেলের ঘুম নেই রাতে।এখনো একই কাজ করে যাচ্ছেন আপনারা।
মানুষ খাওয়ায় স্বাভাবিক।কিন্তু এতোটাও উজাড় করে দেয়না।
আত্মীয়স্বজন আসবে আসুক।সবার শশুর বাড়ি থেকে একদিনই ডেকে এনে খাওয়ানোটা খুব বেশিই হয়ে যায় না?
মাস ছয়েক পরপর হলে তাও মানায়।
আপনি দেখি দু-মাস না যেতেই সবাইকে দাওয়াত দিয়ে এনে খাওয়ান।
রিজিকের ব্যাপারে কথা বলতে নেই।কিন্তু এভাবে আপনার সংসার ধ্বংস হচ্ছে।
আমার সন্তান পেটে।সে জন্যও কিছু সেভিংস তো করতে হবে।
কিন্তু এভাবে চলতে থাকলে সম্ভব কী করে?
এইভাবে কী সংসার চলে?"
আমার কথা শেষ হতেই ছোট ননদ ন্যাকা কান্না কেঁদে
বললেন,"দুদিন হলো আমার বিয়ে হয়নি,তুমি আমায় খাওয়ার খোটা দিচ্ছো।খেয়েছি আমার ভাইয়ের টাকায়।তোমার টাকা বা তোমার বাপের টাকা তো না।
থাকলাম না এ বাড়িতে,খেলাম না এ বাড়িতে।চলে যাবো আমি।
এ বাড়ির খাবার খাওয়ার থেকে বি*ষ খাওয়া অনেক ভালো।তোমার মতো ভাবী কারো না জুটুক।
তোমায় আমি অভিশাপ দিচ্ছি,জীবনে তোমার ভালো হবেনা।
আমার খাওয়ার খোটা দিলেনা তুমি?
তুমি যেন খাবারের অভাবেই মরো।
'মা আমাদের জন্য রাখা মাংসর বাটিগুলো দিয়ে দাও।নাহলে রাক্ষস গুলো সব খেয়ে নেবে।দেখছো না,খাওয়ার জন্যই কেমন ঝগড়া করছে!এদেরকেই পেট ভরেই খাওয়াও মা।এই বাড়িতে আর একমূহূর্ত থাকবো না।
না খেলে,না থাকলে কী এমন হবে!"
নিজেদের ব্যাগ নিয়ে তারা বেরিয়ে যেতে নিল।
বড়ো ননদ পেছন ঘুরে বললো,"আমার মায়ের সংসার তুমিই ধ্বংস করছো।তুমি আসার পর থেকেই এ সংসারে এতো অবনতি।
তুমি আসার আগেই সব ঠিক ছিলো।"
আমি মনে মনে ভাবলাম,তখন তো ঠিক থাকবেই।তখন ইনকামের মানুষ ছিল দুজন।
আমার বিয়ের পর শশুর চাকরি ছেড়েছেন।সব দায়িত্ব এসে পড়েছেন আরিফের ওপর।"
তারা চলে যেতেই শাশুড়িমা তেড়ে এসে বললেন,"দিলে তো মেয়েটাকে কাঁদিয়ে।তোমার জন্য আমার মেয়েরা শান্তিতে এ বাড়িতে খেতে-বসতেও পারবে না।কোন
কূক্ষণে যে তুমি জুটেছিলে এ বাড়িতে!"
আমি উপহাস সূচক হেসে বললাম,"আমি জুটেছিলাম বলেই হয়ত সবাই ভালোভাবে বাঁচতে পারছেন।
অন্যকেউ হলে এ সংসার এতোদিনে ত্যাগ দিত।"
"খুব বেশি সংসার সংসার করছো না?
তাহলে বাকিমাসটা এবার তুমিই চালাবে।"
"এ তো আমার জানা কথা।মাস খরচের অর্ধেকের বেশি টাকা ফুরিয়ে আপনি আমায় দেবেন সংসার চালাতে।
যাতে আমি হিমশিম খেয়ে যাই।আপনার ছেলের কাছে পুনরায় টাকা চাই।আর আমাদের মাঝে অশান্তি হোক।"
"মুখে মুখে চোপা করবে না।তোমার বাজে কথা শুনতে আমি বসে নেই।"
তিনি চলে গেলেন।
আমি চেয়ারে মাথা নত করে বসলাম।
হয়ত ননদদের কথার প্রতিবাদ চাইলেই করতে পারতাম।কিন্তু করিনি কেন জানেন,
কথায় কথা বাড়ে।
কোন জীবনের কথা টেনে এনে জগড়া বাড়াবে।
তারপর পেরে না উঠলে গ্রাম বাসির কাছে লাগাবে।কটু কথা বলবে।আমার নামে লোক নিন্দা হবে।
বউ মানুষ আমি,আমার কথা এলাকার মানুষ খুব বেশি বিশ্বাস করবে না।
একটা বললে তারা তিনটে বলবে।সঙ্গে অভিশাপ তো আছেই।
এদের মুখের অভিশাপ ছাড়া আজ পর্যন্ত কিচ্ছু পাইনি।মাস তিনেক আগে আমার পেটের সন্তানকে নিয়ে বললো।তার তিনদিনের মাথায় মেজোননদের মিসক্যারেজ হলো।
আমায় এক্সিডেন্ট করে মরার অভিশাপ দিল।সেদিন দুপুরেই বড়ো ননদের স্বামীর পা এক্সিডেন্ট হলো।
এরপর থেকে আর এদের কথায় পাত্তা দেইনা আমি।
আমার আল্লাহ্ আছে আমার সঙ্গে।
যার কেউ নেই।তার সৃষ্টিকর্তা আছে।
#চলবে