27/05/2026
#অভিশপ্ত_কল্পনা
#লেখিকা__উর্মিলা
#পর্বঃ১০
https://www.facebook.com/share/p/1DcHwSzW9J/
[❌কপি করা সম্পূর্ণ নিষেধ❌]
#পর্বঃ১১
ঘরটা অস্বাভাবিক নীরব।
কেউ কথা বলছে না,শুধু মাহির দ্রুত শ্বাসের শব্দ।
তার হাত কাঁপছে।চোখদুটো শক্ত করে বন্ধ।মনে হচ্ছে—
সে ভেতরে ভেতরে কোনো যুদ্ধ করছে।আবির রহমান সামনে বসে শান্ত গলায় বলল—
“মাহি…”
“আমার কথা শুনতে পাচ্ছো?”
কয়েক সেকেন্ড।তারপর—ধীরে মাথা নাড়ল মাহি।
“হুম…”
“তুমি এখন নিরাপদ।কেউ তোমার ক্ষতি করবে না।তুমি শুধু যা দেখছো…ওটাই বলো।”
মাহির নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো।
“আমি…”
“আমি হাসপাতালের করিডোরে…অনেক ঠান্ডা…খুব ঠান্ডা....মেহেরিন আমার হাত ধরে আছে…”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।নীলা নিজের অজান্তেই হাত শক্ত করে ধরলো।নাদিয়া আপুও স্থির।
“তারপর?”
আবির রহমান শান্ত গলায় বলল।
“ও কাঁদছিল বারবার বলছিল…চলো…চলো…ওরা আসার আগে আমাদের চলে যেতে হবে…”
“ওরা কারা?”
কোনো উত্তর নেই।শুধু মাহির কপালে ঘাম জমছে।
কয়েক সেকেন্ড পর খুব আস্তে—
“জানি না…”
“কিন্তু…”
“ও খুব ভয় পেয়েছিল…”
“তারপর…”
“আমরা করিডোরের শেষ দিকে গেলাম চার নাম্বার। "
দরজার সামনে ঘরের বাতাসটা যেন ভারী হয়ে উঠলো।
“দরজাটা খোলা ছিল?”
আবির রহমান জিজ্ঞেস করল।মাহি এবার কেঁপে উঠলো।
“না…”
“কিন্তু…ভেতর থেকে শব্দ আসছিল।"
"কেমন শব্দ?”
“কেউ তর্ক করছিল কারো চিৎকার কাঁচ ভাঙার শব্দ…”
নীলা অবাক হয়ে তাকালো।আবির রহমান এবার নোট লিখতে লিখতে বলল—
“তারপর?”
“মেহেরিন বলেছিল দরজা খুলতে না,কিন্তু আমি.. আমি খুলেছিলাম…”
ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা।
“তারপর?”
মাহির চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।
“ভেতরে…অনেক মানুষ কেউ একজন মাটিতে পড়ে ছিল সবাই খুব ভয় পেয়েছিল…”
“তারপর…”
“কেউ আমাদের দেখে ফেলেছিল…”
আবির রহমান এবার একটু সামনে ঝুঁকল।
“কে?”
মাহির হাত কাঁপছে।
“মনে নেই…”
“শুধু…”
“শুধু মনে আছে আমাদের বলা হয়েছিল…এই ঘটনা ভুলে যাও…”
ঘরের ভেতর বাতাস যেন জমে গেল।আবির রহমান চুপ,নীলা চুপ।নাদিয়া আপুও কিছু বলছে না।কয়েক সেকেন্ড পর—মাহি ধীরে চোখ খুলল।পুরো শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
“আমি…”
“আমি কি কিছু মনে করতে পেরেছি?”
কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।আবির রহমান অনেকক্ষণ চুপ করে বসে রইল।তারপর ধীরে ফাইলটা বন্ধ করল।
“হ্যাঁ।তুমি একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস মনে করতে পেরেছো।”
“কি?”
আবির রহমান এবার শান্ত গলায় বলল—
“চার নাম্বার রুমে…কিছু ঘটেছিল।”আর…কেউ চেয়েছিল…ঘটনাটা চাপা পড়ে যাক।”
ঘরটা নিস্তব্ধ।ঠিক তখন আবির রহমানের ফোন কেঁপে উঠলো।অজানা নাম্বার।তিনি কিছুক্ষণ স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকলেন।তারপর ফোনটা ধরলেন।ওপাশে কেউ খুব শান্ত গলায় বলল—
“পুরোনো ফাইল নিয়ে বেশি ঘাঁটাঘাঁটি করবেন না ডাক্তার সব সত্য জানলে
“সবাই ভালো থাকে না…”
লাইন কেটে গেল।ঘরের বাতাসটা হঠাৎ অন্যরকম ঠান্ডা লাগতে শুরু করলো।আর অনেকদিন পর
প্রথমবার আবির রহমানের চোখে অস্বস্তি দেখা গেল।
★★★
বিকেলের আলো ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছিল।
আজকের দিনটা যেন মাহির মাথার ভেতর অনেক কিছু এলোমেলো করে দিয়েছে,পুরোনো ফাইল,
মেহেরিন।চার নাম্বার রুম।আর ছোটবেলার সেই ভুলে যাওয়া স্মৃতি।সবকিছু মাথার ভেতর ঘুরছিল।নীলা চলে গেছে।নাদিয়া আপুও বাসায় ফিরেছে।আবির রহমান শুধু একটা কথাই বলেছিল—
“আজ বেশি চিন্তা করো না।মাথাকে একটু বিশ্রাম দাও।”
কিন্তু—বিশ্রাম কি এত সহজ?মাহি বাসায় ফিরে চুপচাপ নিজের রুমে ঢুকল।মা কয়েকবার ডাকলেন।খাবারও দিলেন।কিন্তু আজ তার খেতে ইচ্ছে করছিল না।মাথাটা ভারী লাগছে।মনে হচ্ছে—কিছু একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস—সে ভুলে গেছে।যেটা তার মনে পড়া দরকার।
খুব দরকার।রাত বাড়তে লাগল।জানালার বাইরে বাতাস।দূরে কোথাও কুকুর ডাকছে।ঘড়িতে রাত ১:১৭।মাহি বিছানায় শুয়ে ছিল।শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল,এবার বই বন্ধ করে মাহি ঘুমানোর চেষ্টা করল।চোখ বন্ধ,কিন্তু ঘুম আসছে না।হঠাৎ—তার মনে হলো কেউ যেন খুব আস্তে বলল—
“মাহি…”
সে চোখ খুলল,রুম অন্ধকার,কেউ নেই,কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকল।তারপর—আবার।
“মাহি…”
এইবার একটু স্পষ্ট।মাহির বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“কে?”
কোনো উত্তর নেই।কিন্তু—তার রুমের দরজাটা খুব ধীরে নিজে নিজে খুলে গেল।
কিঁইইইচ…
মাহির নিঃশ্বাস আটকে গেল।দরজার ওপাশ—
অন্ধকার।স্বাভাবিক করিডোর না।তার বাসার বাইরেও না।বরং—একটা লম্বা হাসপাতালের করিডোর।সাদা দেয়াল,ম্লান আলো,খুব ঠান্ডা,অস্বাভাবিক ঠান্ডা।মাহির বুক কেঁপে উঠল।না।এটা বাস্তব না।বাস্তব হতে পারে না।তার মাথায় হঠাৎ আবির রহমানের কথা ভেসে উঠল—
“ভয় আর স্মৃতি মাঝে মাঝে একসাথে কাজ করে…”
মাহি ধীরে সামনে এগোল।তার পায়ের শব্দ—
ঠক…
ঠক…
ঠক…
পুরো করিডোরে প্রতিধ্বনি হচ্ছে।হঠাৎ—সে থেমে গেল।
দূরে একটা ছোট মেয়ে দাঁড়িয়ে।পিঠ দেখা যাচ্ছে।
মাথা নিচু।হাত দুটো শরীরের পাশে।মাহির গলা শুকিয়ে গেল।
“কে…”
মেয়েটা ধীরে ঘুরল।মাহির বুকের ভেতরটা জমে গেল।মেহেরিন।কিন্তু—আগের মতো না।আজ তার চোখে ভয়।অনেক ভয়।মাহি এতদিন যাকে দেখেছিল সে আসলে মেহেরিন।
“মাহি…”
“তুই এত দেরি করলি কেন…?"
মাহির নিঃশ্বাস কেঁপে উঠল।
“মেহেরিন…”
“আমি…আমার মনে পড়ছে না…”
মেহেরিন কিছু বলল না।শুধু ধীরে হাত তুলল
করিডোরের শেষ প্রান্তের দিকে।মাহি তাকাল।আর তার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।দূরে একটা দরজা।
দরজার উপরে লেখা—৪।ঠিক তখন করিডোরের সব আলো একসাথে নিভে গেল।অন্ধকার।পুরো অন্ধকার।আর সেই অন্ধকারের ভেতর কেউ খুব আস্তে বলল—
“সত্যিটা যেখানে চাপা পড়ে…ভয় সেখানেই জন্ম নেয়…”
মাহি হঠাৎ ধড়ফড় করে উঠে বসল।জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছে।ঘামে পুরো শরীর ভিজে গেছে।রুম অন্ধকার।
ঘড়ির দিকে তাকাল।অনেকদিন পর আবারো মাহি ওই করিডোর নিয়ে স্বপ্ন দেখল।রাত—৩:০৩ তারপর খুব ধীরে—তার চোখ গেল টেবিলের উপর রাখা ডায়েরির দিকে।ডায়েরিটা খোলা।আর শেষ পাতায় লেখা—
“মনে করার সময় হয়ে গেছে।”
★★★
মাহির হাত কাঁপছে।ঘরের বাতাস অস্বাভাবিক ঠান্ডা লাগছে।ঘড়িতে এখন—রাত ৩:০৭,টেবিলের উপর রাখা ডায়েরিটার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে সে।খোলা পাতা।কালো কালি।আর মাত্র একটা লাইন—
“মনে করার সময় হয়ে গেছে।”
মাহির বুকের ভেতর ধকধক করছে।ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামল।রুমের লাইট জ্বালাল, ডায়েরিটা হাতে তুলে নিল।পাতাগুলো উল্টাতে লাগল।প্রথম পৃষ্ঠ ফাঁকা
দ্বিতীয়,ফাঁকা,তৃতীয়,ফাঁকা।কিন্তু—শেষ পাতায় আবারও সেই লেখা।
৩:০৩
“মনে করার সময় হয়ে গেছে।”
মাহির মাথা ঝিমঝিম করছে।না।এটা স্বাভাবিক না।
সে তো এটা লিখেনি।নাকি আবার সে স্বপ্ন দেখছে এটাও কি তাহলে স্বপ্ন।তা না হলে,এটা এলো কোথা থেকে?ঠিক তখন ফোনটা কেঁপে উঠল।মাহি চমকে উঠল।স্ক্রিনে—আবির রহমান কলিং…এত রাতে আবির রহমান বিষয়টা খুবই অস্বাভাবিক, মাহি আসলেই স্বপ্ন দেখছে।
“হ্যালো…”
“মাহি।”
ওপাশের কণ্ঠটা শান্ত।কিন্তু কেমন যেন চিন্তিত।
“তুমি ঠিক আছো?”
“হ্যাঁ…”
“তুমি ঘুমাওনি?”
মাহি চুপ।
কয়েক সেকেন্ড নীরবতা।তারপর—
“আবির ভাই আমার মনে হচ্ছে…আমি কিছু মনে করতে যাচ্ছি…”
ওপাশে কয়েক সেকেন্ড চুপ।তারপর—
“আজ রাতে যদি আবার কিছু দেখো পালানোর চেষ্টা করবে না।শুধু খেয়াল করবে।সবকিছু।ছোট জিনিসও।”
লাইন কেটে গেল। মাহির বুকের ভেতর অদ্ভুত অস্বস্তি।
সে আবার ডায়েরিটার দিকে তাকাল।আর এইবার—
তার চোখ থেমে গেল।শেষ পাতার নিচে—আরেকটা লেখা।যেটা আগে ছিল না।মুহূর্তে—তার মাথার ভেতর যেন কিছু একটা ঝলসে উঠল।হাসপাতালের করিডোর।সাদা আলো।দৌড়ানোর শব্দ।কেউ কাঁদছে।
কেউ বলছে—
“মাহি…”
“লুকিয়ে পড়…তাড়াতাড়ি…”
ধপ!
হঠাৎ—রুমের বাইরে কিছু একটা পড়ার শব্দ।মাহি চমকে দরজার দিকে তাকাল।চুপচাপ।কেউ নেই।তবুও—মনে হচ্ছে বাইরে কেউ দাঁড়িয়ে আছে।খুব চুপচাপ।
খুব স্থির।তার বুক কাঁপতে লাগল।ধীরে দরজার কাছে গেল।হাত বাড়াল।দরজা খুলল, ফাঁকা।পুরো করিডোর ফাঁকা।কিন্তু মেঝেতে একটা জিনিস পড়ে আছে।
পুরোনো।হলদেটে।মাহি নিচু হয়ে সেটা তুলল।একটা ছবি পুরোনো হাসপাতালের ছবি।আর—ছবির কোণায়—দুইটা ছোট মেয়ে।একটা মেহেরিন।আর অন্যটা…
মাহি।তার নিচে কালো কালিতে লেখা—
“রুম ৪”
আর ছবিটার পেছনে খুব ছোট অক্ষরে একটা লাইন—
“যেদিন সত্য মনে পড়বে সেদিন সব বদলে যাবে।”
ঠিক তখন—মাহির ফোনে একটা মেসেজ আসলো।
অজানা নাম্বার।মেসেজটা মাত্র দুই লাইনের—
“অতীতকে খুঁজিস না।কিছু সত্য চাপা থাকাই ভালো।”
সময় যেন একদম স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। সময় আর নড়ছে না, মাহি কি তাহলে সময় থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে? মাহির হাত ঠান্ডা হয়ে গেল।কারণ—মেসেজ পাঠানোর সময় রাত—
৩:০৩
★★★
(চলবে…)