16/08/2023
◼️চিত্রকর : Tahsins Akibuki
◼️আলোকগল্প 📖
"আয়িশা নাওয়ার নাবিহা" - আমার একমাত্র বড় ভাই-ভাবীর একমাত্র ফন্ডিত কইন্যা তিনি। তার সাথে এই পেইন্টিং এর গল্পের পূর্বে কিঞ্চিত তার বর্ণনাটা দিয়ে যাই।
তিনি আমাকে "তাতাই" বলে ডাকেন এখন। তাতাই শব্দের উদ্ভব ও বিকাশ : চাচা > তাতা > তাতাই।
তবে একটা সময় সে আমাকে তাতাই থেকে "বাবা" বলে ডাকতো বেশি। এর পেছনে যথেষ্ট যুক্তিযুক্ত কারণ ও গল্প আছে। যেহেতু ওর বাবা মা দু'জনেই ব্যাংকার। সেহেতু ওর ৬ মাস বয়সের পর থেকে ভাবীকে জবে যেতে হত। তখন ছিল করোনা কালীন সময়। আমার আব্বা আম্মা ছিলেন চট্টগ্রামে বাড়িতে। আর করোনার কারণে আমার ও করা লাগতো হোম অফিস। আমার চোখের সামনে থাকতো ডেক্সটপ, কি-বোর্ড আর কোলে থাকতেন ৬ মাসের নাবিহা। তখন অফিসের কাজ করতে করতেই, ওকে দেখাশোনার জন্য যাবতীয় কাজ আমাকেই করা লাগতো, যেমন : জনৈকার খাওয়াদাওয়া থেকে শুরু করে হাগা-মুতা পরিষ্কার করা, গোসল করানো, সাজুগুজু সব। পরবর্তীতে আরো সময় পর ওকে দেখার জন্য আরেকজন পিচ্চি মেয়ের আগমন ঘটে। কিন্তু সে নিজেও ছোট মানুষ কম বুঝতো বলে আমাকেই আগেপরে থাকা লাগতো এসব নিয়ে।
এবং মজার বিষয় হলো, যখন সে কথা বলা শুরু করলো হালকা হালকা এবং আরো একটু বড় ও হল তখন দেখলাম এই কচি বুড়ি সারাদিন "বাবা" ডাকে আমাকে, আর যখন তার বাপ বাসায় আসতো তেনার ভোল পাল্টে যেত পুরা ৩৬০° তে। আমি আবার "তাতাই" ডাকের আসনে, এবং তার বাপ "বাবা" আসনে।
আরেকটা ছোট গল্প বলে রাখি, নাবিহা হওয়ার আগে আমি কখনোই এত কম বয়সের ছোট বাচ্চা কোলে নিতাম না/ নিতে পারতাম না। কারণ আমার মনে হতো আমি ওদের ধরলেই আমার হাতের চাপে হাড্ডিগুড্ডি ভেঙ্গে যাবে। আর নাবিহার স্বাস্থ্য ও অই বয়সের তুলনায় অনেকটা কম ছিল। তো মূলত এই বুড়ির কারণে আমার এই ছোট বাচ্চা কোলে নেওয়ার ভীতি কেটে যায়। আর প্রাণীদের বিষয়টা কাটে "জোজো" নামের এক আদর কুকুর ছানার জন্য, যেটি আমি আমার আরেকটা আলোকগল্পে বলেছিলাম বিস্তারিত।
এবার আসি এই পেইন্টিং রহস্যে। আমাকে যেহেতু নাবিহা একদম ছোট থেকেই রঙ, তুলি, ক্যানভাস এসব নিয়েই থাকতে দেখতো প্রায় সময়ই, তাই ওর নিজের ও এর প্রতি অনেক আগ্রহ ছিল। ওকে আমি আঁকার জন্য ওর বয়স অনুযায়ী খাতা রঙ পেন্সিল তা দিয়ে দিতাম। ও ওর যা মন চাইতো সেভাবেই দাগাতে থাকতো। কিন্তু তখনো ওকে আমি কখনো শিখানোর চেষ্টা করিনি। সেটা ওর একটা বয়সের জন্য অপেক্ষা করতাম আমি। আমার মাথায় সব সময় থাকতো তখন, আমার আঁকার দুনিয়ার যত সম্পত্তি আছে সব হবে ওর।
এখন আমার রুমের একটা সাইড হচ্ছে আমার কম্পিউটার সেটাপ। এবং এর বিপরীতে হচ্ছে আমার আঁকিবুকির রাজ্য। যেখানে আমি আঁকতে বসলে তখন অনেকটা সময় কাটাই।
আর নাবিহার আমার রুমের প্রতি ছোটবেলা থেকেই প্রবল আকর্ষণ এসবের কারণে। কারণ এই একটা রুম বাকি সব গুলো থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। তাই আমি আমার কাজের মাঝে বা কাজ শেষে দরজা খুললেই সে সেকেন্ডের মধ্যে ঢুকে পড়তো আর আমার ফ্লোরিং বেডে শুয়ে পায়ের উপর পা তুলে চারপাশ দেখতো এবং বলতো যে, "তাতাই চল পেইন্টিং করি তোমার অই কালার গুলো দিয়ে?"
ওর আজকে বয়স ৩ বছর ৬ মাস ১১ দিন। ওকে এতদিন অন্য কালার এবং স্কেচবুক দিলেও ও আজকে আমার আঁকার রাজ্যের রঙ তুলি ক্যানভাসে ঢোকার স্বাধীনতা পাইছে। এবং আজকেই আমি ওকে প্রথম হাত ধরে ওয়াটার কালার কিভাবে করতে হয় সেটার প্রথম ক্লাস নিলাম। এর আগে কিছু শিখালে সেটা অন্য মিডিয়াতে, বা সম্পূর্ণ কোনো পেইন্টিং কমপ্লিট নিয়ে না। এবং মাশাআল্লাহ ও খুব তাড়াতাড়ি আমার বলা কথা গুলো ধরতে পারলো।
যেই পেইন্টিং টা উপরে দিয়ে এতক্ষণ এত পকরপকর করলাম, আমি জানি অনেকে ইতিমধ্যে ম্যাক্সিমাম অনেক আগেই পড়া বন্ধ করে পলায়ন করেছেন এবং কিঞ্চিত বর্ণনার নামে থিসিস কেও হার মানাইলাম, সেটাতে ওর কোলাবোরেশান হচ্ছে :
আমরা প্রথমে ভাবলাম একটা বেলুন আঁকবো। বেলুন টা আঁকার পর ওকে অল্প শেখালাম সেটা কিভাবে ওয়াটারকালার ইউজ করে ফিলাপ করতে হয়। এবং সে পুরোটা সুন্দর মত লাল বেলুন বানাইলো। এরপরই আমার মাথায় আসলো যে আজকে একটা কম্পলিট পেইন্টিং করবো ও সহ। ওকে এর পর কিছুক্ষণ আকাশ মানে Sky, নীল মানে Blue, রঙ মানে Colour এসব নিয়ে বকরবকর করে বুঝাইলাম যে আকাশের রঙ নীল। এবং আজকে আমরা এরকম একটা পেইন্টিং করবো। লাল বেলুনের মত করে চারপাশে তোমাকে এখন নীল রঙ দিয়ে আকাশ বানাতে হবে। সে সেটা শেষ করলো। এবং এতদিন পেইন্টিং করবো করবো করে করে ঘ্যানর ঘ্যানর কর ফন্ডিত শেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো, "তাতাই আজকে আর করবো না ঠিকাসে? পরে আবার করবো ঠিকাসে"। আমিও তাতে সায় দিয়ে বললাল, " হ্যাঁ তাতাই, ওয়াটার কালার করার পর রঙ টা শুকাতে হবে। এর মধ্যে তুমি ভাত খেয়ে নাও এবং ঘুমিয়ে পড়"।
এবং ওর করে দেওয়া ফাউন্ডেশন পেইন্টিং এর উপর আমি ফাইনাল টাচ দিয়ে সেটাকে এই অবস্থায় আনলাম। মহারাণী ঘুম থেকে উঠে বলে, "তাতাই তাড়াতাড়ি দরজা খুলো"
আমি দরজা খুললাম এবং তাকে আমাদের পেইন্টিং দেখিয়ে বললাম, "এটা আমাদের দুজনের করা পেইন্টিং তাতাই"
ভাত খেয়ে এবং ঘুমায়ে হালকা শক্তি হওয়াতে সে আবার রেডিও বাজানো শুরু করলো "চল আবার পেইন্টিং করি তাতাই?"
১৬ অগাস্ট, ২০২৩ এর আলোকগল্পের এখানেই সমাপ্তি ঘোষণা করা হলো। এখন তাতাই মানে আমি আর নাবিহা ছবির এই লাল-হলুদ গাড়ি করে পুরো বাসার রুমে রুমে ঘুরে বেড়াবো।
◼️আলোকচিত্রী : তাহসীন উদ্দীন আহমেদ