21/11/2025
হুবালের পূজারী;
বাড়ির জি_নের জবানবন্দী
::
“এই বংশের কারো উন্নতি হতে দিবে না। মাদরাসায় পড়তে দিবে না। জীবন ধ্বং°স করে দিবে। কারণ রো°গীর দাদা তাদের জায়গায় বাড়ি করেছে। এখন আবার তার সন্তানেরা সব ভেঙে বিল্ডিং উঠাচ্ছে।” কথাগুলো বলছিল হুবালের পূজারী জিন।
হুবাল হলো, নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহিস সালাম এর সময়ে কাবার ভিতর থাকা সবচেয়ে বড় মূর্তিটা। যার পূজা করত তৎকালীন আরবী জা°হেলি সমাজ। কোরআন ও হাদিসে এই হুবালকে নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। তবে হুবালের বিষয়ে বাস্তবিক অর্থে কোন নির্দিষ্ট গুণ শোনা যায়নি। তার ইবাদাত করার নির্দিষ্ট কোন কারণ জানা যায়নি। যেহেতু মেসোপোটেমিয়া বা ব্যাবিলনীয় ও ইন্দো সভ্যতার যোগসাজশ ছিলো তাই ধারণা করা যায় এই ভূমির সাথে হুবাল পূজারীদের একটা সম্পর্ক থাকতে পারে। মানুষের ভিতর হুবাল নামক কারো পূজারী বর্তমানে আছে বলে আমাদের জানা নাই৷
যাইহোক উপরোল্লিখিত মূল ও সত্য জবানবন্দী নিতে কতটা কষ্ট করতে হয়েছে, সেটা ধারাবাহিকতায় বর্ণনা করতে অনেক সময় লাগবে। যেহেতু এই কেইসে একইসাথে কয়েকটা বিষয় শিক্ষণীয় তাই যথাসাধ্য চেষ্টা করব বিস্তারিত জানানোর। ইনশাআল্লাহ।
প্রথম ঘটনা:
আফিফ (ছদ্মনাম)। বয়স ১৫ হবে। প্রথম এসেছিল হিফজ বিভাগে এক মাদরাসায় পড়ে, সেখানে গেলে জি°ন আক্রান্ত হয়। রুক°ইয়াহ শুরু করলেই জি°ন কথা বলে। দাবি করে, দুষ্টুমি করে তাকে ডিস্টার্ব করছে। ওই মাদরাসার হুজুর মাদরাসার উন্নতির জন্য তার কবি°রাজ বন্ধুর মাধ্যমে জি°ন পালে। সেখান থেকে এই ছেলেকে দেখে আসর করেছে। আমি বললাম, এতো কাহিনি শুনে তো আমার লাভ নাই। তোর যেতে হবে এটাই হলো কথা। বেশি সময় লাগলো না। চলে গেল। আমরা বলে দিয়েছিলাম, জি°ন মি°থ্যা বলে সবসময়। তারপরও সতর্কতা বশত পরিবার মাদরাসা চ্যাঞ্জ করে ফেলেছে। তাছাড়া ওই হুজুর বাস্তবে কবি°রাজ চর্চা করত তাই পরামর্শ চাইলে আমিও সায় দিলাম৷
দ্বিতীয় ও মূল ঘটনা:
হঠাৎ শুনতে পেলাম আফিফকে আবারও জি°ন ধরেছে। তার মাদরাসার মোহতামিম নাকি ঝারফোঁক(প্রচলিত) পারে, তিনি চেষ্টা করেছেন বের করতে। কিন্তু পারছেন না। তার কাছে শত শত জি°নের কয়েকটাকে নাকি ইতোমধ্যে আফিফের জিন মেরে ফেলেছে। হুজুরের জিনেরা বলেছে, ইবনে ইসহাকের কাছে নিয়ে যান। উনারা এটা ঠিক করতে পারবে। —এগুলো শুনে আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ ভাইসহ আমরা হাসছিলাম। জিন দিয়ে চিকিৎসা করা অবুঝ ভাইদের এই একটা হালত প্রায়শ শোনা যায়। হাজার হাজার জিনের ইমান গ্রহণ ও হ°ত্যা করে ফেলছেন, এই ধোঁকায় ফেলে জিনরা। আমি বললাম, ওইখানে হয়তো উল্টাপাল্টা অনেককিছু হয়েছে তাই একটু সেল্ফ রুকইয়াহ করে তারপর আসতে বলেন।
কয়েকদিন আমল করে আসলো। কিছুটা কমেছে আগের চেয়ে। কিন্তু এই কয়েকদিনের ঘটনা শুনে আমি পুরো থ খেয়ে গেলাম। জি°নেরা আবারও বলছে, সে আগের কবিরাজ-ই আবার তাদের পাঠিয়েছে। মাদরাসা থেকে চলে আসছে কেন! এই ক্ষোভ থেকে আবারও যেন সে মাদরাসায় নিয়ে যায় তাই জাদু করেছে। জিনদের এই স্টেটমেন্টের উপর ভিত্তি করে তারা ওই মাদরাসায় কবিরাজকে নিয়ে এসেছে। কেন এমন করল? এসব জিজ্ঞাসাবাদে একসময় মারধর করে ওই কবি°রাজকে। অথচ সে কিছুই জানেনা। বাবা-ও নিজের ছেলের এমন অবস্থা দেখে ধরে রাখতে পারেনি। আশপাশের মানুষও তার কাছে বাচ্চার অবস্থা দেখে ভিক্ষা চাচ্ছে, জিন যেন ছেড়ে দেয়।
কবি°রাজও ক্ষেপে গিয়ে পুলিশ নিয়ে হাজির। আফিফের মাদরাসার মোহতামিম যিনি মূলত জি°নদের জবানবন্দী নিয়ে এই ঝামেলা পাকিয়েছিলেন, তাকে ও আফিফের বাবাকে তুলে নিয়ে যেতে আসছে। পুলিশের সামনেও জি°ন বলে আমাকে এই কবিরাজ পাঠিয়েছে। যাক, মামলা ওইখানে শেষ হলেও পারত। তারপরও আরো অনেক ঝামেলা হয় পুলিশ ও থানা নিয়ে। ওদিকে চতুর্মুখী হুমকিতে বাচ্চা ও তার ফ্যামিলি।
এদিক মাদরাসার মোহতামিম তার ছাত্রের উপর প্রেক্টিস করছেন ঝারফোঁক। জিন শরীরে নিয়ে এসে মাদরাসার কার কী, তার পরিবারের কার কী হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে এসব গায়ব নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছেন৷ জিনেরাও একটার পর আরেকটা এসে একেক কথা জানাচ্ছে। এরমধ্যে ছেলের শরীরের অবস্থা খারাপ। এতো বেশি জিন আসাতে দুর্বল হয়ে গেছে। শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যাওয়ার অবস্থা। হাসপাতালে ভর্তি পর্যন্ত করাতে হয়েছে।
এসব শুনে আমি পুরো থ! যা বলার বলে রুকইয়াহ শুরু করলাম। জি°ন আসলো। কথা বলতে চাচ্ছিল, অমুকে পাঠিয়েছে। এই হয়েছে ওই হয়েছে। আমি বললাম, এসব শোনার সময় আমার নাই। তোরা বের হতে হবে। এটাই ফাইনাল কথা। নাহয় শুনতে থাক তিলাওয়াত।
এরিমধ্যে হঠাৎ ঝাঁকুনি দিয়ে আরেকটা জি°ন। এসে সালাম দিল। তাকে নাকি মোহতামিম সাহেব মুমিন বানিয়েছে। সে শুনেছে আমি অনেক ভালো তাই আসছে। তারা নাকি এখন আল্লাহর ওলিদের সোহবত নেয়, সেই ধারাবাহিকতায় এই আগমন। আমি বললাম, ফাইজলামির একটা লিমিট আছে। আমি তো অমুক না যে আমার সাথে এসব করবি। মানুষের শরীরে কোন মুমিন ঢুকতে পারে না। এভাবে কষ্ট দিতে পারে না। জনসাধারণের মাঝে বসবাস করাও অনুমোদন নাই; তুই মুমিন? তাহলে তোদের থাকার স্থান তো পাহাড়। এখনি বের হয়ে যা। সে চলে গেলেও আফিফের শরীরের অবস্থা ভালো না। এতোই দুর্বল হয়েছে এই কয়েকদিনে তাকে এখন রুকইয়াহ করাও সম্ভব না। এক মাসের আমল দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দিলাম।
পাঠানোর আগে বললাম, এখানে ঘটনা অন্যকিছু। জি°ন আপনাদের মনোযোগ সরানোর জন্য বিভিন্ন নাটক করছে, গল্পের প্লট সাজাচ্ছে। আপনার পরিবার ও অতীত নিয়ে বসতে হবে। মূল সমস্যা না ধরলে এর সমাধান সম্ভব না। এভাবেই কাহিনি করে যাবে।
অবশেষে:
বাবা যাওয়ার পর কল দিল। বললেন, আপনি বলার পর আমরা অনেক ভেবেছি। পরে হিস্টোরি মনে করে দেখলাম এমন অভিজ্ঞতা আগের থেকেই আছে। আফিফের বাবা-মা যতদিন বাড়িতে ছিলো অনেক সমস্যা হতো। অসুস্থতা ছিলো। মনোমালিন্য এক্সট্রিম পর্যায়ের হতো। বাহিরে থাকলে ভালো হলেও ঘরে আসতে না আসতেই ঝ°গড়া বেঁধে যেত। তার বাবা চাচা কাউকেই মাদরাসায় পড়াতে পারেনি৷ পাঠালেই চলে আসতো। বিভিন্ন সমস্যা হতো। আফিফের দাদিও অসুস্থতায় ভুগত। বাড়িতে বিভিন্ন সমস্যা হতো।
আন্দাজ অনুযায়ী সবকিছু মিলে যাওয়ায় একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। এভাবেই বাড়ির জিন ঘরের মানুষদের দীনদার হওয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সামনেরবার আশাকরি সমাধান হবে। ইনশাআল্লাহ। এই আশ্বাস দিয়ে কল রাখলাম। কিন্তু আমার অসুস্থতার কারণে শিডিউল দিয়েও পরেরবার রুকইয়াহ করতে পারিনি, অবাক কাণ্ড হলো আমি অসুস্থ হয়েছি সেদিন সকালেই। তাই আরেক ভাই করেছিলেন। পরে শুনেছি সেদিন অনেক জোর দেখিয়েছে। ঝামেলা করে শেষে চলে গেছে। তবে সেটা চলে যাওয়া না, ডুব দেয়া বলে।
কিছুদিন পর আমাকে জানালে বললাম শেষ সিরিয়ালটা নিয়ে আসুন৷ এটার পর আর কিছু না থাকায় লং টাইম রুকইয়াহ করা যায়। আজকে প্রথমে আসেনি। একটু একটু করে ফুঁসতে ফুঁসতে উপস্থিত হচ্ছে। আমি কিছুক্ষণ পড়ে তার দুর্বল পয়েন্ট খুঁজছিলাম। এরমধ্যে কাঁধে ধরাতে শক্তি দেখানো শুরু করল। আফিফের বাবা ও আমাদের আরেকজন রাকিসহ ধরেও পারছিল না। আমাকে মারবে৷ মেরে ফেলবে। একা আসার জন্য চ্যালেঞ্জ দিচ্ছে। কার কথা কে শুনে, আমি পড়ছিলাম। কিন্তু কোনভাবে ধরে রাখা যাচ্ছিল না৷ পাঞ্জাবি ও গেঞ্জি খুলে তেল দিতে বললাম। দিয়ে এবার ঘাড়ে ধরতেই অবস্থা খারাপ। ছাঁই দিয়ে মাছ ধরলে যেমন হয়। সবগুলো পয়েন্ট দুর্বল করে ফেলেছি। এবার তো তাকে ছাড়ার জন্য কাকুতি মিনতি। ভাবলাম, এখনি সময় জবানবন্দি নেয়ার। রিমান্ডে এতক্ষণে আসামী বসেছে।
জিন কাকুতি মিনতি করে যাচ্ছে। আমি বললাম, এখানে কেন এসেছিলি? আমার দাদা ঢুকিয়েছে। আমি কিছু জানিনা। আরো চাপ দেয়ায় অহংকার নিয়ে বলছে, ওরা আমাদের বাড়িঘর ভেঙ্গেছে। ওরে রাখব নাকি? শেষ করে দিব সবগুলোকে। কোন ধর্মের জিজ্ঞেস করলে বলে, হুবালের পূজা করি। প্রথমে বুঝিনি। আবার জিজ্ঞেস করলে একই জবাব৷ এই বাঙালি জিন হুবাল পেল কোথায় আমার মাথা ঢুকছে না। যাইহোক, শয়°তানের নাতির সাথে কথা বলে কোন লাভ হচ্ছে না। তাকে বুঝালেও সে বুঝছে না। তাই বললাম, তোর দাদাকে ডাক দে। এখনি দে। এসবকিছুই করছি ঘাড়ে ধরে।
ছোট জিনের দাদা এসে প্রথমেই রাগান্বিত। এই কে আমাকে ডাকল! কেন ডাকল! যেই ঘারে চাপ দিয়ে কিছু আয়াত পড়ে ফু দিলাম। আর কয়েকটা মাইর লাগালাম। তখনি নরম। বললাম, এমন ভাব দেখাস কাকে? বলে, বুঝিনি এখানে আসার আগে। তারপর জিজ্ঞাসাবাদ করলে সে সব কথা তুলে ধরে— আফিফের দাদা যেখানে বাড়ি করেছিল সেখানে ছিলো এই জিনদের বাসস্থান। তাদের জায়গায় থাকায় প্রথম তেমন কিছু করেনি। এখন সব গাছপালা কেটে বিল্ডিং উঠাচ্ছে তাই নতুন করে ক্ষেপেছে। তাদের কাউকে শান্তিতে থাকতে দিবে না। উন্নতি করতে দিবে না; এই পণ করেছে। আমি বললাম, তুই তো প্রথমেও ওর বাবা মায়ের মধ্যে বিচ্ছেদ করতে চেয়েছিলি? বলল, এটাই তো আমাদের কাজ। হুবালের নির্দেশ এই কাজ করতে হবে৷ বললাম, হুবালকে তাহলে বল আজকে তোকে বাঁচাতে? বলছে- না, ওই বেডি কত্তে বাঁচাইব। মানে হুবাল তার জানামতে একজন মহিলা। হুবালের ধর্ম ছেড়ে ইসলাম গ্রহণ করতেও সে নারাজ। তবে ভারতবর্ষে হুবালের অনুসারী কিভাবে হলো সে তথ্য তার কাছে পাওয়া যায়নি। তার চাচাদের ছেড়ে যেতে রাজি না, কারণ তারা তাবিজের চর্চা করে; এজাতীয় বিষয় প্রেক্টিস করলে বাড়ির জিন আরো শক্তিশালী হয় এবং আসন গেড়ে বসে। যেহেতু তারা আমার ও আফিফের বাবার নিয়ন্ত্রণে নাই তাই ইগনোর করলাম । বললাম, এখন ফাইনাল কথা হলো এই ছেলের শরীর ছেড়ে যাবি। আর কোনোদিন আসবি না৷ কসম খেয়ে তোর নাতিপুতি সব নিয়ে বের হ! সুন্দরভাবেই অল্পতে সব নিয়ে বের হয়ে গেল। এখন আলহামদুলিল্লাহ তিন মাস যাবত আফিফ সুস্থ। আগামীতেও তার ও পরিবার অন্যান্য সদস্যদের আল্লাহ তায়ালা যেন হেফাজতে রাখেন৷ আমিন।
এখান থেকে আমরা যা যা শিখলাম:
—জি°ন স্বভাবগত মিথ্যুক। তার প্রধানতম গুণ সে ধোঁকাবাজ। সুতরাং যেসকল কবি°রাজ ও রা°কি জি°নের কথায় নাচে তারা চরম ভুল করে। এমন বোকার দল থেকে আল্লাহ তায়ালা সকলকে হেফাজত করুন।
—বাড়ির জি°নের সমস্যা থাকলে অনেক কিছুই হয়। একইরকম সিমটমস সবার মধ্যে দেখা যায়। বিচ্ছেদ, পারিবারিক সম্পর্ক নষ্ট, দীনের ব্যাপারে অনিহা, উন্নতি করতে না পারা, ওয়াসওয়াসা, বদ°মেজাজ ইত্যাদি স্বভাব দেখা যায়। কবি°রাজের জি°নের সামর্থ্যে না থাকলে জা°দু বলে চালিয়ে দেয় তাই এই ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে।
—মূল কেইস না বুঝলে জি°ন যেতে চায় না৷ কারণ সে তো জানেই চিকিৎসক একটা বোকা প্রকৃতির লোক৷ তাকে এমন ধোঁকা দেয়াই যাবে। তাই মূল ঘটনা বুঝাটা জরুরি। কোন রাকি এমন সমস্যা সমাধান করতে না পারলে উচিত সিনিয়র রাকিদের নিকট রেফার করে দেয়া।
—ইবনে ইসহাক
(সিনিয়র রুকইয়াহ কন্সাল্টেন্ট)