18/09/2026
কিছু মানুষও ঠিক আতরের শিশির মতো।
তারা যখন আমাদের জীবনে থাকে, তখন তাদের উপস্থিতির মূল্যটা হয়তো আমরা বুঝি না। অথচ তারা যখন চলে যায়, তখন তাদের স্মৃতি, তাদের বলা কথাগুলো, তাদের ভালোবাসা—সবকিছু মিলে চারপাশে এমন এক অনুভূতি ছড়িয়ে দেয়, যা আর কখনো আগের মতো করে পাওয়া যায় না।
কোনো একদিন বাবার কাঁধে মাথা রেখে যে মানুষটি নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল, একদিন সেই বাবার কবরের পাশে দাঁড়িয়ে বুঝতে পারে—কিছু আশ্রয় হারিয়ে গেলে পৃথিবীর সব ছায়াও যেন ছোট হয়ে যায়।
কোনো মা শেষবারের মতো সন্তানের মাথায় হাত রেখে যখন চোখ বন্ধ করেন, তখন ঘরটা শুধু একজন মানুষকে হারায় না; হারায় একটি পৃথিবী। তার হাতের রান্নার গন্ধ, ডাক দেওয়ার স্বর, অভ্যাসের ছোট ছোট শব্দ—সবকিছু তখন স্মৃতির ভেতর থেকে আরও তীব্র হয়ে ফিরে আসে। যেন আতরের শিশি ভেঙে গেছে, আর ঘ্রাণটা চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে—কিন্তু শিশিটা আর কখনো আগের অবস্থায় ফিরবে না।
কখনো কোনো প্রিয় বন্ধুত্ব হঠাৎ ভেঙে যায়। শেষ কথোপকথনের পর দুজন মানুষ হয়তো আর কখনো কথা বলে না। অথচ বহু বছর পরও কোনো পুরোনো গান, কোনো পরিচিত রাস্তা কিংবা কোনো বিকেলের বাতাস সেই মানুষটাকে মনে করিয়ে দেয়। সম্পর্কটা নেই, কিন্তু তার ঘ্রাণ রয়ে গেছে।
আবার কখনো একটি বড় স্বপ্ন ভেঙে যায়। যে মানুষটি বছরের পর বছর একটি লক্ষ্যের জন্য ছুটেছে, শেষ মুহূর্তে যখন সবকিছু হারিয়ে যায়, তখন সেই ব্যর্থতাও তাকে বদলে দেয়। সে হয়তো আগের মানুষটি আর থাকে না। ভাঙনের মধ্য দিয়েই সে নিজের অন্য এক রূপ আবিষ্কার করে।
আর মৃ*ত্যু—সেটা হয়তো এই কথাটার সবচেয়ে গভীর অর্থ।
একজন মানুষ চলে যাওয়ার পর তার শরীর থাকে না, কণ্ঠ থাকে না, স্পর্শ থাকে না; কিন্তু তার রেখে যাওয়া ভালোবাসা, শিক্ষা, স্মৃতি আর অসমাপ্ত কথাগুলো জীবিত মানুষগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মানুষটি তখন আর পাশে নেই, অথচ তার উপস্থিতি যেন আরও বেশি অনুভূত হয়।
তাই কিছু বিদায় শেষ হয়ে যাওয়া নয়;
কিছু বিদায় হলো এমন এক ভাঙন, যার পর মানুষটি থাকে না—
থেকে যায় শুধু তার অসাধারণ ঘ্রাণ।
আতরের শিশি ভাঙলে ঘ্রাণ ছড়ায় শেষবারের মতো;
আর কিছু মানুষ হারিয়ে গেলে, তাদের ভালোবাসা ছড়িয়ে থাকে আমাদের জীবনের বাকি সময়টুকু।