16/11/2025
১লা ডিসেম্বর থেকে সেন্টমার্টিন পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত হচ্ছে। কিন্তু আপনি ট্যুর প্ল্যান ও খরচ নিয়ে টেনশনে আছে। নানান প্রশ্ন আপনার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে? এ পোস্ট পুরোটা পড়েন।
👉 এখন কি সেন্টমার্টিন যাওয়া যায়?
না, যাওয়া যায় না। কারণ ডে লং ট্যুর অনুমোদনের কারণে মানুষের আগ্রহ নেই। ফলে জাহাজ বন্ধ।
👉 টেকনাফ থেকে যাওয়া যায় না?
টেকনাফ বা শাহপরীর দ্বীপ থেকে পর্যটক যাওয়া যায় না। পর্যটকরা শুধুমাত্র জাহাজে করে যেতে পারবে।
👉 টেকনাফ থেকে অনেকে গিয়েছে দেখলাম! তারা কিভাবে গেছে?
আপনি যাদের কথা বলছেন তারা কেউ পর্যটক হিসেবে যায়নি।
টেকনাফ থেকে সাংবাদিক, রিসোর্ট মালিক বা পার্টনার, রিসোর্টের কর্মচারী, ব্যবসায়ী যাদের ব্যবসা সেন্টমার্টিন রিলেটেড, গবেষক, এনজিও প্রতিনিধি, সরকারি কোন প্রজেক্টের কাজে ও যাদের বৈবাহিক সূত্রে সেন্টমার্টিন আত্মীয়স্বজন আছে তারা টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনের লিখিত অনুমতি নিয়ে যেতে পারেন।
👉 তাহলে কবে থেকে সেন্টমার্টিন যাওয়া যাবে?
সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ১লা ডিসেম্বর থেকে যেতে পারবেন।
👉 কি নিয়ে যেতে হবে?
আগেই বলছি, শুধু জাহাজ নিয়ে যেতে হবে। কারণ ট্রাভেল পাস জাহাজের টিকিটের সাথে সংযুক্ত থাকবে।
👉 ট্রাভেল পাস কিভাবে নেব?
সেটা আপনি যে এজেন্সির মাধ্যমে টিকেট কাটবেন তারা করে দিবে।
👉 টিকিট কাটতে কি কি লাগবে?
আপনার এন আইডি ও যারা সাথে যাবে তাদের আইডি কার্ড। যদি আইডি কার্ড না থাকে তাহলে জন্ম নিবন্ধন লাগবে। আর বিদেশি হলে পাসপোর্ট এর কপি।
👉 টিকিট কার থেকে কাটব?
এটা নিয়ে একটু ঝামেলা আছে। কারণ জাহাজগুলো তাদের বেশিরভাগ টিকিট নিবন্ধিত এজেন্টদের দিয়ে বিক্রি করে। এক্ষেত্রে আপনার বিশস্ত ও পরিচিত এজেন্ট থেকে টিকিট নিবেন। অপরিচিত কারো কাছ থেকে নিলে যদি সে প্রতারক হয় তাহলে আপনার ট্যুর ও টাকা দুইটাই মাটি হয়ে যাবে।
👉 টিকিট কি সফট কপি নিলে হবে?
না। আপনাকে অবশ্যই হার্ড কপি সাথে আনতে হবে। কারণ টিকিটের উপর থাকা কিউআর কোডই হচ্ছে আপনার ট্রাভেল পাস। এটা ছাড়া ঘাটে আপনাকে আটকাবে। টিকিটের ফটোকপিও গ্রহণযোগ্য না।
👉 ভাড়া কি রকম?
এবার মাত্র দুই মাস পর্যটক সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করতে পারবে সেজন্য ভাড়া বৃদ্ধি করেছে জাহাজ কর্তৃপক্ষ। একেক জাহাজ একেক রকম ভাড়া নির্ধারণ করে। তবে এখন পর্যন্ত আমি জেনেছি ৩৪০০/- সর্বনিম্ন ভাড়া। এটা আটলান্টিক ক্রুজের ভাড়া।
👉 কোন জাহাজ ভালো?
আপনার এ প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে একটু পক্ষপাতি হয়ে যায়। কারণ এ রুটে অনুমোদিত সব জাহাজই সমুদ্রের উপযোগী। তবে গতি, ধারণক্ষমতা, সার্ভিস ও অন্যান্য মিলিয়ে বারো আউলিয়া জাহাজের রিভিউ ভালো। এর পর কর্ণফুলী যদিও আমি কখনো কর্ণফুলীতে ভ্রমণ করিনি। আমি আসলে সেন্টমার্টিন-কক্সবাজার রুটে জাহাজে করে আসা-যাওয়া করিনি।
👉 কোন সময় সেন্টমার্টিন ভ্রমণ করা ভালো?
এখন যেহেতু মাত্র দুমাস ফলে আলাদা করে সময় বলা কঠিন। কারণ প্রকৃতির সবচেয়ে সুন্দর ভিউ পাওয়া যায় তো সেপ্টেম্বর থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। কিন্তু এখন সে সময় ভ্রমণের অনুমতি নেই।
👉 ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মধ্যে কোন সময়টা ভালো হবে?
ডিসেম্বরের শুরুতে জ্যোৎস্নার রাত আছে এবং সিজনের শুরু সে কারণে এটা উত্তম সময় হবে।
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে শেষ পর্যন্ত স্কুল কলেজ ছুটি, সপ্তাহিক ছুটি ও সাধারণ ছুটি মিলিয়ে একটা চাপ থাকতে পারে। ফলে এসময় এড়িয়ে চলা ভালো। কারণ সবাই এক সাথে ছুটি পাওয়ার কারণে পর্যটন স্পট গুলোতে হুমড়ি খাওয়া অবস্থা। এতে খরচ বেশি হয়ে যায় এবং সার্ভিস কম পাওয়া যায়।
👉 সেন্টমার্টিন ভীড় কখন কম থাকে?
মাত্র দুই হাজার মানুষের দৈনিক সেন্টমার্টিন যেতে পারবে। ফলে এখানে ভিড়ের কিছু নাই। সব সময় মুটামুটি একই অবস্থা হবে।
👉 কোন বিচ বেশি সুন্দর?
এটা প্রশ্নের মধ্যে পড়ে না। কারণ সেন্টমার্টিনের চারপাশের সৈকত আলাদা আলাদা সুন্দর। তবে যেহেতু অনেকের জানার আগ্রহ আছে তাই উত্তর দিচ্ছি। সূর্যোদয়ের দৃশ্য(আরাকান পর্বত থেকে) দেখার জন্য পূর্ব সৈকত ভালো। সাগরে গোসল করার জন্য নিরাপদ উত্তর পশ্চিম বিচ ভালো, সূর্যাস্ত দেখার জন্য পশ্চিম বিচ ভালো। আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য দক্ষিণ বিচ। ম্যানগ্রোভ বন ও দ্বীপের শেষ প্রান্ত দক্ষিণ সৈকতে।
👉 ছেঁড়া দ্বীপে যাওয়া যাবে?
না। সরকারি নিষেধাজ্ঞা আছে। এটা পরিবেশ অধিদপ্তরের অধিগ্রহণ করা সম্পত্তি। ফলে মানুষের যাতায়াত বন্ধ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রশাসনের লোক পাহারায় থাকে। গতবছর কিছু মানুষ ভোরে অটো নিয়ে দ্বীপের শেষপ্রান্ত গিয়ে গোপনে ছেঁড়া দ্বীপ গেছে শুনেছি। এবার সে কৌশল কাজে আসবে কিনা জানি না! ধরা খেলে বড় বেইজ্জতি হতে হবে। কান ধরে কিছুক্ষণ দাঁড় করিয়ে রাখতে পারে। সুতরাং ছেঁড়া দ্বীপ ট্যুর প্ল্যান থেকে বাদ দিবেন।
👉 সেন্টমার্টিন দেখার মতো কি আছে?
যারা নতুন তাদের জন্য এটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। পুরো দ্বীপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আধার। নীল সমুদ্রের ঢেউ, অগুনিত পাথর, প্রবাল, ঝিনুক, ঝিনুক পাহাড়, কেয়াবন(প্রবেশ নিষিদ্ধ), ম্যানগ্রোভ বন, পাথরের ভাস্কর্য(বিড়ালের গুহা), পাথর মানব(দূর থেকে মানুষের মতো দেখায়), জেলেদের জীবন জীবিকা ইত্যাদি অনেক কিছু দেখার আছে। তবে প্রকৃতি প্রেমীদের জন্যই সেন্ট মার্টিন সুন্দর। যারা কৃত্রিম সৌন্দর্য পছন্দ করে তাদের সেন্টমার্টিন না যাওয়া ভালো।
👉 থাকার ব্যবস্থা কেমন?
এখানে থাকার ব্যবস্থা দুই রকম।
১/ বিভিন্ন রিসোর্ট ও হোটেল
২/ হোম স্টে বা বাড়িতে থাকা।
👉 ভাড়া কেমন?
রিসোর্টের লোকেশন, রুম কোয়ালিটি ও সার্ভিসের উপর ভাড়া নির্ভর করে। বিচের পাশের হোটেলে ভাড়া বেশি। সাধারণত ৩০০০-১৮০০০/- পর্যন্ত হয়। চাপের কারণে কম বেশি হতে পারে।
★ পশ্চিম পাশ সূর্যাস্তের দৃশ্যের জন্য জনপ্রিয় ফলে সেদিকের ভাড়া বেশি।
★ তার পর উত্তর বিচ সাগরের নিরাপদ গোসল করার জন্য জনপ্রিয়। ফলে সেখানেও ভাড়া বেশি।
★ ইকো রিসোর্টগুলো পরিপাটি ও বেশ সুন্দর করে করা। এবং কাপলদের জন্য বেশ জনপ্রিয়। ফলে সেগুলো ভাড়াও বেশি।
★ রাস্তার পাশের হোটেল, বাজার ও জেটি ঘাটের আশেপাশের হোটেল এবং পূর্ব সৈকতের হোটেল রিসোর্ট অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়া যায়।
★ হোম স্টে বা মানুষের বাসাবাড়িতে থাকতে চাইলে একদম কম খরচে থাকার ও খাওয়ার ব্যবস্থা হয়। কম বলতে আলোচনা করে যা দেওয়া যায়! এগুলোকে কমিউনিটি বেজ ইকো-ট্যুরিজম বলা হয়।
👉 হোম স্টের সুবিধা অসুবিধা কি?
সাধারণ মানুষের সাথে এবং তাদের জীবনযাত্রার সাথে কয়েকটি দিন মিলেমিশে থাকা ও খাওয়া এবং তাদের আড্ডা দেওয়া যায়।
সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে, শহুরে জীবন থেকে হুট করে অজপাড়াগাঁর মানুষের সান্নিধ্যে এসে তাদের সুখের দুখের গল্প শোনা, সমুদ্রের মাঝে প্রকৃতির সাথে মিলেমিশে থাকা এবং দুর্যোগ দুঃসময়ের সংগ্রামের গল্প শোনে শোনে কিছুদিন কাটানো।
তবে অসুবিধাও আছে অনেক। সেন্ট মার্টিনের গ্রামীণ পরিবেশ পর্যটন বান্ধব না। ভাষাগত জটিলতায় পড়তে পারেন।
পুরুষদের সময় কাটানো কঠিন, কারণ মহিলারা বেশিরভাগ পর্দানশীন, এবং অপরিচিত কারো সাথে কথা বলে না। দেখাও যাবে না! দেখা গেলো লাইনে পানি নাই, কিন্তু কাউকে বলতে পারছেন না! কিন্তু ঠিকই ঘরে মানুষ আছে, নড়াচড়া করতাছে!
বিদ্যুৎ ও বার্থ রুম নিয়ে সমস্যায় পড়বেন। কারণ তাদের অনেকের নিজস্ব জেনেটর নাই। এবং বেশিরভাগ পাড়ার ভিতর।
👉 খাবার ব্যবস্থা কেমন?
সেন্টমার্টিন অনেক খাবারের রেস্টুরেন্ট আছে। অনেক রিসোর্টের সাথেও রেস্টুরেন্ট আছে।
এছাড়া বাজার, প্রতিটি মোড় ও রাস্তার পাশে অনেক রেস্টুরেন্ট আছে।
👉 দাম কেমন?
দাম আপনার পছন্দের মেনুর উপর নির্ভর করবে। কিছু রিসোর্ট ও রেস্টুরেন্টের খাবারের প্যাকেজ থাকে। এক রাত দুইদিন হলে ৪ বেলার প্যাকেজ। দাম আসলে আগে থেকে বলা কঠিন কারণ জিনিসপত্র দাম এদিকে সেদিক হলে দামও এদিকসেদিক হয়।
সাধারণত ১০০০/- থেকে ১২০০/- পর্যন্ত হতে পারে যদি বারবিকিউ ও সামুদ্রিক মাছের প্যাকেজ নেন।
আর দুইরাত তিন দিনের প্যাকেজ ৭ বেলা হয়। এক্ষেত্রে ১৭০০-২০০০/- পর্যন্ত হতে পারে।
👉 নিজে কিনে রান্না করা যাবে?
এটা খাজনার চেয়ে বাজনা বেশি। কিছু মানুষ চাপাবাজী বা কিপটেমি করতে গিয়ে কিনে খেতে চায়। এরা মনে করে টাটকা খাইতে হলে কিনে নিয়ে রান্না করতে হবে। এটা আসলে সময় ও টাকা অপচয় ছাড়া কিছুই না। আহামরি টাকা বাঁচে না। এবং কখনো খারাপ মাছ বা কম দামী মাছ বেশি দামে কিনতে হয়!
রান্না করতে হলে কোন রেস্টুরেন্টের সাথে আলোচনা করে খরচাপাতি দিয়ে করা যায়। এছাড়া কোন বাড়িতেও দিয়ে রান্না করে খাওয়া যায়। এক্ষেত্রে নিজেদের তত্ত্বাবধানে রান্না ভালো। কারণ স্থানীয় পদ্ধতি ও আপনার রান্না পদ্ধতি এক না।
👉 ওখানে কি ভালো ফটোগ্রাফার পাওয়া যাবে?
বাংলাদেশের সব পর্যটন কেন্দ্রে কম বেশি ফটোগ্রাফার আছে। সুতরাং সেন্টমার্টিনও আছে। তবে দরদাম করে দেওয়া ভালো। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা যায় একই পোজে একাধিক ছবি উঠে সেগুলো নিয়ে ভাড়াবাড়ি বেশি হয়। আবার দেখা যায় ছবি বেশি তোলে, বেছে বেছে কয়েকটি নিয়ে বাকিটা অনেকে নেনা এটাও ঝামেলা।
👉 অটোনিয়ে অনেক অনেক অভিযোগ শুনেছি সেটা কি সত্যি?
অটো ভাড়া নিয়ে অনেক কথা শুনেছি। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে দ্বীপে সরকারি বিদ্যুৎ সেবা নাই। ফলে অটোওয়ালা বেশি দামে ব্যাটারি চার্জ করে এবং তারা দুই মাসের ইনকাম দিয়ে ১০ মাস বসে থাকবে সেজন্য ভাড়া অন্যান্য যায়গার তুলনায় বেশি।
আমি পরামর্শ দিব, দরদাম করে বা আগে থেকে ভাড়া জেনে উঠবেন। যে রিসোর্টে যাবেন আগে থেকে তাদের থেকে ভাড়া জেনে নেবেন।
👉 শুটকি মাছ কি ভালো পাওয়া যাবে?
হ্যাঁ ডিসেম্বরের শুরু থেকে মাঝামাঝি স্থানীয় শুটকি পাবেন। পরে চাহিদা বেড়ে গেলে বাহির থেকে আমদানি করা হয়। দাম সেন্টমার্টিন হিসেবে ঠিক আছে। কিন্তু কক্সবাজার হিসেবে বেশি মনে হবে।
👉 জিনিসপত্রের দাম কেমন?
যাতায়াত খরচ ও ঘাটের টুলের কারণে জিনিসপত্রের দাম বেশি। অন্যান্য যায়গায়র থেকে সামান্য বেশি।
👉 গ্রুপে যাওয়া ভালো? বাকি নিজেরা যাওয়া ভালো?
গ্রুপের সুবিধা হচ্ছে খরচ কম। আর অসুবিধা হচ্ছে মনমতো সব হয় না।
নিজেরা যাওয়ার সুবিধা হচ্ছে ইচ্ছেমতো সব ম্যানেজ করা যায়। অসুবিধা হচ্ছে পদে পদে অন্যের সহযোগিতা লাগে!
বিঃদ্রঃ এটা আমার ব্যক্তিগত অভিমত। কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের জন্য লেখা না। সুতরাং এ লেখা ১০০% নাও মিলতে পারে। কোথাও গিয়ে এটা দেখিয়ে সুবিধা চাইবেন না। এখানে এরকম লেখা আছে বলে রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করবেন না।
© Tayub ullah ভাই এর ওয়াল থেকে যিনি একজন স্থানীয় বাসিন্দা